৫০০ টাকায় Gas Leak Detection System — ইদ্রিস স্যারের ক্লাসের গল্প

Gas Leak Detection Alarm System

আমাদের বিজ্ঞান স্যার ইদ্রিস আলী স্যার অনেক মজার মানুষ। চকগোপাল উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ান। মান্দা উপজেলায়। নওগাঁ জেলায়। স্যার সবসময় নতুন কিছু নিয়ে আসেন ক্লাসে।

গত সপ্তাহে স্যার ক্লাসে একটা ছোট বাক্স নিয়ে আসলেন। বাক্সের ভেতরে তার আর ছোট ছোট যন্ত্র। স্যার বললেন আজকে একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দেখাবো। এইটা দিয়ে গ্যাস লিক হলে বোঝা যাবে। বাজার বাজবে।

আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। করিম বললো স্যার এইটা কিনছেন কোথায়। স্যার হাসলেন। বললেন নিজেই বানাইছি।

আমার কাছে মনে হয় স্যার অনেক অনেক বুদ্ধিমান।

এইটা কেন দরকার

স্যার বোঝাতে শুরু করলেন। বললেন আমাদের গ্রামে অনেক বাড়িতে গ্যাসের চুলা আছে। গ্যাস লিক হলে বোঝা যায় না। গন্ধ না পেলে বুঝতেই পারা যায় না। তারপর একটা ম্যাচ জ্বাললেই বিস্ফোরণ হতে পারে।

স্যার বললেন মান্দা উপজেলায় কয়েক বছর আগে একটা বাড়িতে এইভাবে আগুন লেগেছিল। তখন থেকে স্যার ভাবছিলেন এর সমাধান করতে হবে। তাই এই Gas Leak Detection Alarm System বানাইছেন।

আমার মনে হয় স্যার শুধু পড়ান না। সত্যিকারের সমস্যাও সমাধান করেন।

এইটা কিভাবে কাজ করে

স্যার বললেন এইটা বোঝা আসলে সহজ। চারটা জিনিস বুঝলেই হবে।

একটা সেন্সর থাকে। সেইটা গ্যাসের গন্ধ বুঝতে পারে। তারপর আর্ডুইনোকে সিগন্যাল পাঠায়। আর্ডুইনো দেখে গ্যাস বেশি কিনা। বেশি হলে বাজার বাজায়।

স্যার বললেন মনে করো তোমার নাক আর মস্তিষ্ক। নাক গন্ধ পায়। মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়। এইখানে সেন্সর হলো নাক। আর্ডুইনো হলো মস্তিষ্ক।

রহিম বললো তাহলে বাজার হলো চিৎকার! স্যার হেসে বললেন একদম ঠিক বলেছিস!

কি কি লাগবে

স্যার টেবিলে সব জিনিস সাজিয়ে রাখলেন। আমরা সবাই সামনে থেকে দেখলাম।

Arduino Uno লাগবে। এইটা মূল মস্তিষ্ক। MQ-2 নামে একটা সেন্সর লাগবে। এইটা গ্যাস বোঝে। LPG প্রোপেন ধোঁয়া সব ধরতে পারে। LED লাগবে। বিপদ হলে জ্বলবে। Buzzer লাগবে। বিপদ হলে বাজবে। ২২০ ওহম রেজিস্টর লাগবে। ব্রেডবোর্ড আর জাম্পার তার লাগবে।

স্যার বললেন সব মিলিয়ে পাঁচশো ছয়শো টাকার মধ্যে হয়ে যাবে। নওগাঁ শহরে যেকোনো ইলেকট্রনিক্স দোকানে পাওয়া যাবে।

মিতু জিজ্ঞেস করলো স্যার এইটা কি গ্রামের সাধারণ মানুষের কাজে আসবে? স্যার বললেন অবশ্যই। এইজন্যই বানাইছি।

সার্কিট কিভাবে লাগাবো

Gas Leak Detection Alarm System | Circuit design
Gas Leak Detection Alarm System সার্কিট ডিজাইন — ইদ্রিস আলী স্যার ক্লাসে দেখাইলেন

স্যার বললেন তার লাগানো দেখে কঠিন মনে হয়। কিন্তু আসলে সহজ।

সেন্সরের VCC পিন আর্ডুইনোর 5V তে লাগাতে হবে। GND পিন GND তে। আর আউটপুট পিন A0 তে। LED লাগাবো D8 পিনে। কিন্তু সরাসরি না। মাঝখানে ২২০ ওহম রেজিস্টর দিতে হবে। নাহলে LED পুড়ে যাবে। Buzzer লাগাবো D9 পিনে।

স্যার বললেন একটা নিয়ম মনে রাখবে। লাল তার মানে পজিটিভ। কালো তার মানে নেগেটিভ। এইটা মাথায় থাকলে অনেক ভুল কমে যাবে।

স্যার আরো বললেন সব লাগানো হলে বিদ্যুৎ দেওয়ার আগে একবার ভালো করে দেখো। সব তার ঠিকমতো গেছে কিনা। ঢিলা থাকলে কাজ হবে না।

সেন্সর কিভাবে কাজ করে

স্যার বললেন MQ-2 সেন্সরের ভেতরে একটা গরম জিনিস থাকে। গ্যাস আসলে সেই জিনিসের সাথে বিক্রিয়া হয়। তখন রেজিস্ট্যান্স বদলায়। সেই বদল ভোল্টেজ সিগন্যালে পরিণত হয়। আর্ডুইনো সেইটা পড়ে।

স্যার বললেন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা। সেন্সর নতুন হলে আগে ৩০ সেকেন্ড গরম হতে দিতে হয়। না দিলে ভুল রিডিং দেবে। এইটাকে বলে Warm Up।

আর সেন্সরের পেছনে একটা ছোট নব আছে। সেইটা দিয়ে কতটুকু গ্যাসে অ্যালার্ম বাজবে সেইটা ঠিক করা যায়। এইটাকে বলে Calibration। স্যার বললেন Calibration না করলে হয়তো একটু গ্যাসেই বাজবে। অথবা অনেক গ্যাসেও বাজবে না।

করিম জিজ্ঞেস করলো স্যার কিভাবে বুঝবো কতটুকু ঠিক আছে? স্যার বললেন Serial Monitor দেখবে। পরিষ্কার বাতাসে রিডিং দেখো। তারপর গ্যাস কাছে আনলে রিডিং দেখো। মাঝামাঝি একটা সংখ্যা threshold হিসেবে কোডে দিয়ে দাও।

কোড কিভাবে লিখলেন

স্যার Arduino IDE খুললেন। বললেন এই কোডটা দেখো।

// চকগোপাল উচ্চ বিদ্যালয়
// মান্দা উপজেলা, নওগাঁ জেলা
// Arduino Gas Leak Detection Alarm System

const int gasSensorPin = A0;   // সেন্সর A0 পিনে
const int ledPin = 8;           // LED D8 পিনে
const int buzzerPin = 9;        // Buzzer D9 পিনে

int thresholdValue = 400;       // এই মানের বেশি হলে বিপদ

void setup() {
  Serial.begin(9600);
  pinMode(ledPin, OUTPUT);
  pinMode(buzzerPin, OUTPUT);
  digitalWrite(ledPin, LOW);
  digitalWrite(buzzerPin, LOW);

  // সেন্সর গরম হওয়ার সময়
  Serial.println("সেন্সর গরম হচ্ছে। ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করো...");
  delay(30000);
  Serial.println("প্রস্তুত। গ্যাস পরীক্ষা শুরু।");
}

void loop() {
  // সেন্সর থেকে রিডিং নাও
  int sensorValue = analogRead(gasSensorPin);

  // Serial Monitor এ দেখাও
  Serial.print("সেন্সর রিডিং: ");
  Serial.println(sensorValue);

  // গ্যাস বেশি হলে অ্যালার্ম বাজাও
  if (sensorValue >= thresholdValue) {
    digitalWrite(ledPin, HIGH);   // LED জ্বালাও
    tone(buzzerPin, 1000);        // বাজার বাজাও
  } else {
    digitalWrite(ledPin, LOW);    // LED নিভাও
    noTone(buzzerPin);            // বাজার বন্ধ করো
  }

  delay(500); // আধা সেকেন্ড পর পর চেক করো
}

স্যার প্রতিটা লাইন বোঝালেন। gasSensorPin মানে সেন্সর A0 পিনে আছে। thresholdValue হলো ৪০০। এইটার উপরে গেলে বিপদ। setup() এ সেন্সর ৩০ সেকেন্ড গরম হয়। loop() এ প্রতি আধা সেকেন্ডে রিডিং দেখে। ৪০০ এর বেশি হলে LED জ্বলে আর Buzzer বাজে।

স্যার বললেন thresholdValue নিজে ঠিক করতে হবে। Serial Monitor এ রিডিং দেখে বুঝতে হবে কোন পরিবেশে কত সংখ্যা আসছে।

কোড আপলোড করলেন

স্যার USB দিয়ে বোর্ড কম্পিউটারে লাগালেন। Tools থেকে Arduino Uno সিলেক্ট করলেন। Port সিলেক্ট করলেন। তারপর Upload বাটন চাপলেন।

Done uploading দেখালো। Serial Monitor খুললেন। লেখা আসলো সেন্সর গরম হচ্ছে ৩০ সেকেন্ড অপেক্ষা করো।

আমরা সবাই চুপ করে অপেক্ষা করলাম। ৩০ সেকেন্ড পর লেখা আসলো প্রস্তুত গ্যাস পরীক্ষা শুরু। তারপর সেন্সর রিডিং দেখাতে শুরু করলো।

স্যার গ্যাসের লাইটার কাছে নিলেন। গ্যাস বের করলেন জ্বালালেন না। সেন্সরের কাছে ধরলেন। রিডিং বাড়তে শুরু করলো। ৪০০ পার হলো। LED জ্বলে গেলো! Buzzer বাজলো!

আমরা সবাই চিৎকার দিয়ে উঠলাম! রহিম লাফ দিলো। মিতু হাততালি দিলো। স্যার হাসলেন।

সমস্যা হলে কি করবো

স্যার বললেন প্রথমবার সব ঠিক না হওয়াই স্বাভাবিক। কিছু সমস্যা বারবার হয়।

সেন্সর রেসপন্স না করলে প্রথমে চেক করো গরম হওয়ার সময় দিছো কিনা। ৩০ সেকেন্ড না দিলে ভুল রিডিং আসবে। তার সংযোগ ঠিক আছে কিনা দেখো।

ভুল অ্যালার্ম বাজলে মানে ছোট কারণেও বাজলে সেন্সরের নব ঘুরিয়ে সংবেদনশীলতা কমাতে হবে। অথবা thresholdValue বাড়িয়ে দাও।

কোড আপলোড না হলে Port ঠিকমতো সিলেক্ট করা আছে কিনা দেখো। USB কেবল ঢিলা কিনা দেখো। স্যার বললেন এইটা সবচেয়ে বেশি হয়।

সেন্সর জানালার কাছে রাখলে রোদ বা গরম বাতাসে ভুল সিগন্যাল দিতে পারে। ছায়ায় রাখলে ভালো।

কোথায় কোথায় লাগানো যাবে

স্যার বললেন এইটা অনেক জায়গায় কাজে আসবে। রান্নাঘরে গ্যাস সিলিন্ডারের কাছে লাগালে লিক হলে বাজবে। স্টোররুমে লাগানো যাবে। ছোট হোটেল বা দোকানে লাগানো যাবে।

রহিম বললো স্যার আমাদের বাড়িতে লাগিয়ে দেবেন? স্যার হাসলেন। বললেন তুই নিজেই লাগাতে পারবি। আজকে তো শিখলি।

স্যার বললেন সেন্সর গ্যাস সিলিন্ডারের নিচের দিকে রাখবে। কারণ LPG গ্যাস ভারি। নিচে জমে। উপরে রাখলে ধরতে পারবে না।

আরো ভালো করা যাবে

স্যার বললেন এইটা আরো উন্নত করা যাবে। WiFi লাগালে মোবাইলে মেসেজ আসবে। গ্রামে না থাকলেও জানা যাবে। GSM Module লাগালে SMS যাবে। ইন্টারনেট ছাড়াও।

Relay লাগালে গ্যাস লিক হলে নিজে নিজে গ্যাসের লাইন বন্ধ হয়ে যাবে! স্যার বললেন এইটা সবচেয়ে উন্নত ব্যবস্থা। ভবিষ্যতে এইটাও বানাবেন।

করিম বললো স্যার তখন তো পুরো স্মার্ট বাড়ি হয়ে যাবে! স্যার হাসলেন। বললেন হ্যাঁ। এইটাকেই বলে Smart Home

নিরাপত্তার কথা

স্যার গম্ভীর হলেন। বললেন একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি। এই সিস্টেম সাহায্য করবে। কিন্তু এইটাই একমাত্র নিরাপত্তা না।

গ্যাসের লাইনে সরাসরি আর্ডুইনো বোর্ড রাখবে না। আগুনের কাছে রাখবে না। ৫ ভোল্টে চলে এইটা নিরাপদ। কিন্তু ভুল সংযোগ করলে সমস্যা হতে পারে।

স্যার বললেন এইটা বাড়তি সতর্কতার জন্য। মূল নিরাপত্তা হলো গ্যাসের লাইন ঠিকমতো রাখা। নিয়মিত চেক করা। আর অ্যালার্ম বাজলে দ্রুত জানালা দরজা খুলে বাতাস দেওয়া।

শেষে বলি

ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার সময় রহিম বললো আজকের ক্লাস সবচেয়ে মজার ছিল। মিতু বললো স্যার সত্যিই অনেক ভালো। আমিও মনে মনে একমত হলাম।

স্যার ইদ্রিস আলী শুধু বইয়ের পড়া পড়ান না। বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধান করতে শেখান। মান্দা উপজেলার চকগোপাল উচ্চ বিদ্যালয়ের আমরা অনেক ভাগ্যবান এমন স্যার পেয়েছি।

তাই আমার মনে হয় সবার এই গ্যাস অ্যালার্ম একবার বানানো উচিত। ঘর নিরাপদ থাকবে। আর অনেক কিছু শেখাও হবে!