রাস্পবেরি পাই (Raspberry Pi) কি? খুদে কম্পিউটারের অবাক করা 10 Magic
রাস্পবেরি পাই (Raspberry Pi) হলো একটি অসাধারণ ছোট্ট কম্পিউটার, যার আকার মাত্র একটা ক্রেডিট কার্ডের সমান! এটি আসলে একটা সিঙ্গেল-বোর্ড কম্পিউটার (Single-Board Computer), যা খুব কম দামে পাওয়া যায় এবং অসম্ভব কাজ করতে পারে।
কম্পিউটার বলতেই আপনার চোখে হয়তো বিশাল এক প্রসেসর আর তারের জঞ্জাল ভাসে। সেই ভারি সিপিইউ টেবিলের নিচে রেখে পা নাড়ানোর জায়গা পান না অনেকেই। আবার মাঝেমধ্যে মনে হয় যদি কম্পিউটারটা পকেটে নিয়ে ঘোরা যেত তবে কতই না ভালো হতো।
এই সমস্যার সমাধান নিয়ে আজকের এই বিস্তারিত আলাপ যা আপনার চিন্তাভাবনা বদলে দেবে। ছোট এই Raspberry Pi বোর্ডটি দিয়ে আপনি এমন সব কাজ করতে পারবেন যা ভাবলে অবাক হবেন।
যারা প্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন কিছু করতে চান তাদের জন্য এই লেখাটি একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে।
রাস্পবেরি পাই (Raspberry Pi) কি?
রাস্পবেরি পাই হলো একটি খুব ছোট, সস্তা এবং শক্তিশালী কম্পিউটার। এটাকে একটা ক্রেডিট কার্ডের মতো আকারের ছোট বোর্ড বলা যায়। এর ভেতরে Processor, RAM, USB port, HDMI, WiFi, Bluetooth—সবই আছে।
মূলত শিক্ষার জন্য তৈরি হলেও আজ এটি দিয়ে লোকজন ঘরে ঘরে অনেক কিছু বানাচ্ছে—Smart mirrors, gaming consoles, home servers, media players, robots, security cameras,এমনকি ইন্টারনেট রেডিও পর্যন্ত।
এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দাম খুবই কম (৪০০০-১০০০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়) এবং এটি দিয়ে প্রোগ্রামিং, ইলেকট্রনিক্স, আইওটি শেখা যায় খুব সহজে।

ছোট্ট এই বোর্ডটি আসলে লাখ লাখ মানুষের ক্রিয়েটিভ প্রজেক্টের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
একে আপনি আপনার পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারবেন আবার প্রয়োজনে এটি দিয়ে বড় বড় সার্ভার বা রোবট নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
আসলে আমরা অনেক সময় ছোট ছোট কাজের জন্য অনেক টাকা খরচ করে দামী কম্পিউটার কিনি। কিন্তু আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় প্রোগ্রামিং শেখা বা ঘরের সাধারণ কাজগুলো অটোমেটিক করা তবে বিশাল সিপিইউ কেনার দরকার নেই।
Raspberry Pi আপনাকে সেই স্বাধীনতা দেয় যেখানে আপনি খুব অল্প খরচে নিজের পছন্দমতো একটি সিস্টেম তৈরি করে নিতে পারেন।
এটি আপনার ডেস্কটপ কম্পিউটারের প্রায় সব কাজই করতে সক্ষম কিন্তু আকারে এটি একটি ক্রেডিট কার্ডের সমান। এই বৈপ্লবিক পরিবর্তনটি আমাদের কম্পিউটার ব্যবহারের ধারণা পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
আজকের এই লেখায় আমি আপনাদের জানাবো Raspberry Pi আসলে কী এবং এটি দিয়ে আপনি কী কী করতে পারবেন।
অনেকে মনে করেন এগুলো শুধু ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ কিন্তু বিশ্বাস করুন একজন সাধারণ মানুষও এটি দিয়ে অনেক মজার কাজ করতে পারেন। আমরা ধাপে ধাপে এর প্রতিটি অংশ এবং ব্যবহারের নিয়মগুলো জানবো।
আপনি যদি একজন শিক্ষার্থী হন বা প্রযুক্তিতে শখের কাজ করতে ভালোবাসেন তবে এই গাইডটি আপনার জীবনের অন্যতম সেরা একটি লার্নিং হতে যাচ্ছে। চলুন তবে শুরু করা যাক এই খুদে কম্পিউটারের রোমাঞ্চকর যাত্রা।
রাস্পবেরি পাই (Raspberry Pi) এর অবাক করা ১০ ম্যাজিক
রাস্পবেরি পাই শুধু একটা ছোট কম্পিউটার না। এটা আসলে একটা ম্যাজিক বক্স। নিচে এমন ১০টা অবাক করা বিষয় দিলাম, যেগুলো অনেকেই জানে না, কিন্তু জানলে ভাববে এটা সত্যিই crazy powerful।
১. রাস্পবেরি পাই সুপারকম্পিউটার হতে পারে
শুনতে অবিশ্বাস্য, কিন্তু অনেকগুলো Raspberry Pi একসাথে জোড়া দিলে একটা mini supercomputer বানানো যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্লাস্টার বানিয়ে parallel computing শেখায়। মানে ছোট বোর্ড দিয়েই বড় লেভেলের computing concept শেখা যায়।
২. এটা দিয়ে স্যাটেলাইট কন্ট্রোল হয়েছে
আসলেই হয়েছে। কিছু শিক্ষামূলক satellite project এ Raspberry Pi ব্যবহার করা হয়েছে। মহাকাশে ছোট স্যাটেলাইটের brain হিসেবে কাজ করেছে এই বোর্ড।
৩. পাই দিয়ে ATM বানানো যায়
পূর্ণাঙ্গ ATM system বানানো যায় Raspberry Pi দিয়ে। Card reader, camera, database সব attach করে real banking demo তৈরি করা সম্ভব।
৪. এটা দিয়ে Face Recognition Doorlock বানানো যায়
OpenCV আর camera module ব্যবহার করে এমন smart door বানানো যায় যেটা আপনার মুখ চিনলেই দরজা খুলবে। কোন password লাগবে না।
৫. পাই দিয়ে নিজস্ব Google বানানো সম্ভব
আপনি চাইলে নিজের personal search engine বানাতে পারেন Raspberry Pi দিয়ে। শুধু নিজের ডকুমেন্ট, pdf, নোটস সার্চ করবে। একদম private Google।
৬. এটা দিয়ে লাই ডিটেক্টর বানানো যায়
Sensor লাগিয়ে heart rate, skin response measure করে polygraph type lie detector বানানো যায়।
৭. পাই দিয়ে পুরো রেডিও স্টেশন চালানো যায়
Online radio station host করা যায় Raspberry Pi দিয়ে। Live streaming, playlist automation, সব এক বোর্ডে।
৮. এটা দিয়ে AI face emotion reader বানানো যায়
Camera দিয়ে কার মুখ দেখে সে খুশি না দুঃখী সেটা detect করা যায়। Marketing আর psychology research এ ব্যবহার হয়।
৯. পাই দিয়ে গাড়ি রিমোট কন্ট্রোল করা যায়
WiFi বা mobile app দিয়ে বাস্তব গাড়ি স্টার্ট, লক, GPS tracking সব করা যায়। একদম real IoT।
১০. এটা দিয়ে নিজের cloud server বানানো যায়
Google Drive বা Dropbox ছাড়াই নিজের private cloud বানানো যায় Raspberry Pi দিয়ে। নিজের ফাইল, নিজের server, কোন third party নেই।
কেন সবাই এখন Raspberry Pi এর গল্প করছে?
Raspberry Pi হলো একটি সিঙ্গেল বোর্ড কম্পিউটার বা সংক্ষেপে যাকে SBC বলা হয়। সহজ করে বললে একটি মাদারবোর্ডের ওপর যখন প্রসেসর, র্যাম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পোর্টগুলো একসাথে বসানো থাকে তাকেই সিঙ্গেল বোর্ড কম্পিউটার বলে।
এটি মূলত ইংল্যান্ডের Raspberry Pi ফাউন্ডেশন তৈরি করেছে যাতে সাধারণ মানুষ সস্তায় কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পায়।
তারা চেয়েছিল ছোট বাচ্চারা যেন খুব সহজেই কম্পিউটারের ভেতরকার কাজগুলো বুঝতে পারে এবং কোডিং শিখতে পারে।
এটি এমন একটি ডিভাইস যা দিয়ে আপনি ইন্টারনেটে ব্রাউজ করা থেকে শুরু করে হাই ডেফিনিশন ভিডিও পর্যন্ত দেখতে পারবেন।
মনে করুন আপনার একটা পুরনো মনিটর ঘরে পড়ে আছে কিন্তু তার সাথে লাগানোর মতো কোনো সিপিইউ নেই।
আপনি চাইলে মাত্র কয়েক হাজার টাকায় একটি Raspberry Pi কিনে সেই মনিটরের সাথে লাগিয়ে সেটিকে একটি চমৎকার কম্পিউটারে রূপান্তর করতে পারেন।
এটি চালানোর জন্য খুব বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় না যা একে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছে।
বড় কম্পিউটারের বদলে এটি ব্যবহার করলে আপনার বিদ্যুৎ বিলও অনেক কম আসবে। এটি মূলত লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমে চলে যা অত্যন্ত সুরক্ষিত এবং ওপেন সোর্স।
আমার এক বন্ধু একবার ভাবছিল তার বাসার জন্য একটি ছোট মিডিয়া সার্ভার বানাবে যেখানে সে সব সিনেমা জমিয়ে রাখবে। সে বড় কম্পিউটার না কিনে একটি Raspberry Pi ব্যবহার করে সেটা করে ফেলেছে।
এখন সে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে তার ফোনের মাধ্যমে সেই মুভিগুলো দেখতে পারে। এটাই হলো Raspberry Pi এর আসল মজা।
এটি আপনাকে সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ দেয় এবং আপনার ছোট ছোট আইডিয়াগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে সাহায্য করে। এটি কেবল একটি যন্ত্র নয় বরং এটি একটি শেখার মাধ্যম যা আপনার বুদ্ধিকে শাণিত করবে।
এই খুদে কম্পিউটারের শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?
Raspberry Pi এর জন্ম হয়েছিল একটি মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যা শিক্ষা ব্যবস্থায় বিপ্লব আনতে চেয়েছিল। ২০০৬ সালের দিকে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার ল্যাবরেটরির কয়েকজন গবেষক লক্ষ্য করলেন যে ছাত্রছাত্রীরা কম্পিউটার হার্ডওয়্যার সম্পর্কে খুব কম জানে।
তারা ভাবলেন এমন কিছু একটা বানানো দরকার যা দামেও সস্তা হবে আবার যা দিয়ে হার্ডওয়্যারের একদম ভেতরে ঢুকে কাজ করা যাবে। দীর্ঘ কয়েক বছরের গবেষণার পর ২০১২ সালে তারা প্রথম মডেলটি বাজারে আনেন।
তখন তারা ভাবেননি যে এটি এত বেশি জনপ্রিয়তা পাবে যা সাধারণ শৌখিন মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে।
শুরুতে লক্ষ্য ছিল মাত্র কয়েক হাজার পিস বিক্রি করা কিন্তু বর্তমানে এটি কোটি কোটি মানুষের হাতে পৌঁছে গেছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের কাছে এটি একটি আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তারা যখন দেখল মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ ডলারের মধ্যে একটি কম্পিউটার পাওয়া সম্ভব তখন সবাই এটি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠল।
ধীরে ধীরে এর বিভিন্ন ভার্সন বাজারে আসতে শুরু করল এবং প্রতিবারই তারা এর ক্ষমতা বাড়াতে লাগল।
বর্তমানের মডেলগুলো এতটাই শক্তিশালী যে এগুলো দিয়ে এখন জটিল সব গাণিতিক হিসাব বা ডাটা অ্যানালাইসিসের কাজও করা হচ্ছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় Raspberry Pi মূলত বাচ্চাদের পাইথন প্রোগ্রামিং শেখানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এর নামটির পেছনেও একটি কারণ আছে যেখানে পাই শব্দটি পাইথন ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে নেওয়া হয়েছে।
আমার কাছে মনে হয় এই ছোট বোর্ডটি শুধু একটি আবিষ্কার নয় এটি একটি নীরব বিপ্লব।
এটি সাধারণ মানুষের হাতে এমন এক ক্ষমতা তুলে দিয়েছে যা আগে কেবল বড় বড় কোম্পানির ল্যাবে সীমাবদ্ধ ছিল।
বর্তমানে এটি শুধু স্কুলেই সীমাবদ্ধ নয় বরং মহাকাশ গবেষণায় নাসা পর্যন্ত এটি ব্যবহার করছে।
Raspberry Pi দিয়ে কি সত্যিই সব সম্ভব?
Raspberry Pi দিয়ে আপনি কী করতে পারবেন তার কোনো নির্দিষ্ট তালিকা নেই কারণ আপনার কল্পনাশক্তিই এর শেষ সীমানা।
সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি কাজ হলো একে মিডিয়া সেন্টার হিসেবে ব্যবহার করা। আপনি একে টিভির সাথে লাগিয়ে একটি স্মার্ট টিভি বক্স বানিয়ে ফেলতে পারেন যা দিয়ে ইউটিউব বা নেটফ্লিক্স দেখা যাবে।
আবার অনেকে এটিকে ব্যবহার করে নিজের বাসার সিকিউরিটি ক্যামেরা সিস্টেম তৈরি করেন।
যেহেতু এটি আকারে ছোট তাই একে যেকোনো কোণায় লুকিয়ে রাখা সম্ভব যা নজরদারির জন্য দারুণ কাজে দেয়।
আপনি যদি স্মার্ট হোম বা অটোমেশন নিয়ে কাজ করতে চান তবে Raspberry Pi আপনার সেরা বন্ধু হতে পারে। এটি দিয়ে আপনি এমন সিস্টেম বানাতে পারেন যা সূর্য ডুবলে নিজে নিজেই আপনার ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দেবে।
অথবা বাগান করার শখ থাকলে এমন একটি যন্ত্র বানাতে পারেন যা মাটির আর্দ্রতা মেপে গাছে পানি দেবে। এই কাজগুলো করতে খুব বেশি জটিল কোডিং লাগে না ইন্টারনেটে অনেক রেডিমেড প্রোজেক্ট পাওয়া যায়।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এটি দিয়ে একটি ছোট্ট ওয়েব সার্ভার চালিয়েছি যা খুব কম খরচে আমার ওয়েবসাইট হোস্ট করে রাখত।
অনেকে আবার এটি দিয়ে রেট্রো গেমিং কনসোল তৈরি করে পুরনো দিনের মারিও বা কন্ট্রা গেমগুলো খেলে থাকেন।
এটি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রোগ্রামিং প্র্যাকটিস করার একটি ল্যাবরেটরি হিসেবে কাজ করে। আপনি যদি রোবোটিক্স পছন্দ করেন তবে চাকা আর সেন্সর লাগিয়ে একে একটি বুদ্ধিমান রোবটও বানিয়ে ফেলতে পারেন।
আমি একবার একটি ছোট রোবট কার বানিয়েছিলাম যা ঘরের আসবাবপত্র চিনে নিজেই পথ চলতে পারত। আপনার যদি শেখার আগ্রহ থাকে তবে Raspberry Pi আপনার সামনে এক বিশাল সম্ভবনার দুয়ার খুলে দেবে।
Raspberry Pi বোর্ডের ভেতর কী কী থাকে?
Raspberry Pi বোর্ডের দিকে তাকালে আপনি অনেকগুলো ছোট ছোট পার্টস দেখতে পাবেন যা একে পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার বানিয়েছে।
এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর প্রসেসর বা CPU যা পুরো বোর্ডের মস্তিষ্ক হিসেবে কাজ করে। এর পাশেই থাকে RAM যা মাল্টিটাস্কিং করতে সাহায্য করে।
তবে মনে রাখবেন বড় কম্পিউটারের মতো এখানে আপনি র্যাম আলাদাভাবে বাড়াতে পারবেন না। বর্তমানের নতুন মডেলগুলোতে ৮ জিবি পর্যন্ত র্যাম পাওয়া যাচ্ছে যা সাধারণ সব কাজের জন্য যথেষ্ট।
বোর্ডটিতে বেশ কিছু USB পোর্ট থাকে যেখানে আপনি মাউস, কিবোর্ড বা পেনড্রাইভ লাগাতে পারবেন।
ইন্টারনেট সংযোগের জন্য এতে ইথারনেট পোর্ট এবং বিল্ট-ইন ওয়াইফাই ও ব্লুটুথ সুবিধা থাকে। আপনার মনিটর বা টিভির সাথে যুক্ত করার জন্য এতে HDMI পোর্ট দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে মজার অংশ হলো এর GPIO পিনগুলো যা দিয়ে আপনি বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পার্টস যেমন এলইডি বা সেন্সর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
এটিই মূলত একে সাধারণ কম্পিউটার থেকে আলাদা করেছে কারণ সাধারণ পিসিতে আপনি সরাসরি কোনো তার দিয়ে সেন্সর কানেক্ট করতে পারেন না।
Raspberry Pi তে কোনো হার্ড ড্রাইভ থাকে না বরং এখানে একটি SD card ব্যবহার করা হয়। এই এসডি কার্ডেই আপনার অপারেটিং সিস্টেম এবং সব ফাইল জমা থাকে।
এটি অনেকটা ফোনের মেমোরি কার্ডের মতো যা খুলে আপনি যেকোনো সময় ডেটা ব্যাকআপ নিতে পারেন।
পাওয়ার দেওয়ার জন্য এতে একটি USB টাইপ সি বা মাইক্রো ইউএসবি পোর্ট থাকে যা সাধারণ মোবাইলের চার্জার দিয়েই চালানো সম্ভব।
তবে ভালো পারফরম্যান্সের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভোল্টেজের অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করা জরুরি যা আমরা পরে বিস্তারিত আলোচনা করব।
কোন মডেলটি আপনার জন্য সেরা হবে?
বাজারে Raspberry Pi এর অনেকগুলো মডেল রয়েছে যা আপনাকে শুরুতে কিছুটা দ্বিধায় ফেলে দিতে পারে। সবচেয়ে লেটেস্ট এবং শক্তিশালী মডেল হলো Raspberry Pi 5 যা পারফরম্যান্সের দিক থেকে অতুলনীয়।
এটি দিয়ে আপনি খুব স্মুথলি ৪কে ভিডিও দেখতে পারবেন এবং ভারি সফটওয়্যার চালাতে পারবেন।
তবে আপনি যদি একদম নতুন শুরু করেন এবং বাজেট একটু কম থাকে তবে Raspberry Pi 4 মডেলটিও দারুণ কাজ করবে। এতেও পর্যাপ্ত ক্ষমতা আছে এবং এটি দিয়ে প্রায় সব ধরনের প্রোজেক্ট অনায়াসেই করা যায়।
আরেকটি মজার মডেল হলো Raspberry Pi Zero যা আকারে অত্যন্ত ছোট এবং দামেও অনেক সস্তা। এটি মূলত পোর্টেবল বা ছোট প্রজেক্টের জন্য ব্যবহার করা হয় যেখানে জায়গার সীমাবদ্ধতা আছে।
তবে যারা কেবল প্রোগ্রামিং শিখতে চান তাদের জন্য Raspberry Pi 400 নামে একটি মডেল আছে যা দেখতে একটি কিবোর্ডের মতো।
এই কিবোর্ডের ভেতরেই পুরো কম্পিউটারটি বসানো থাকে যা সরাসরি মনিটরে কানেক্ট করলেই কাজ শুরু করে দেয়। নতুনদের জন্য এটি একটি অল-ইন-ওয়ান প্যাকেজ হিসেবে কাজ করে।
আমি সবসময় পরামর্শ দিই আপনার প্রয়োজন বুঝে মডেল বাছাই করার জন্য। আপনি যদি শুধু একটি ওয়েব সার্ভার বা সাধারণ অটোমেশন করতে চান তবে দামী মডেলের দরকার নেই।
কিন্তু আপনি যদি একে ডেস্কটপ হিসেবে ব্যবহার করতে চান তবে অন্তত ৪ জিবি র্যামের একটি ভার্সন কেনা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
আমার প্রথম কেনা বোর্ডটি ছিল পাই ৩ এবং সেটি দিয়েই আমি প্রথম কোডিং এর হাতেখড়ি নিয়েছিলাম।
আপনি যা-ই কিনুন না কেন মনে রাখবেন প্রতিটি মডেলেরই নিজস্ব কিছু বিশেষত্ব আছে যা আপনার প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম।
Raspberry Pi চালাতে আর কী কী প্রয়োজন?
শুধু একটি বোর্ড কিনলেই কিন্তু আপনার কাজ শেষ হয়ে যাচ্ছে না এর সাথে আরও কিছু আনুষঙ্গিক জিনিস লাগবে।
প্রথমত আপনার একটি ভালো মানের Micro SD card প্রয়োজন যেখানে আপনি অপারেটিং সিস্টেমটি ইনস্টল করবেন।
আমি পরামর্শ দেব অন্তত ১৬ জিবি বা ৩২ জিবি এর একটি ক্লাস টেন এসডি কার্ড নিতে যাতে স্পিড ভালো পাওয়া যায়। এরপর লাগবে একটি Power Supply বা চার্জার যা পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারবে।
অনেকে মোবাইলের চার্জার দিয়ে কাজ চালান কিন্তু এতে মাঝেমধ্যে বোর্ডটি রিস্টার্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে।
আপনার কমান্ডগুলো দেওয়ার জন্য একটি কিবোর্ড এবং একটি মাউস দরকার হবে যা আপনি যেকোনো সাধারণ দোকান থেকেই কিনতে পারেন।
ডিসপ্লে দেখার জন্য একটি মনিটর বা HDMI সাপোর্টেড টিভি লাগবে। যদি আপনার মনিটরটি পুরনো ভিজিএ পোর্টের হয় তবে আপনাকে একটি কনভার্টার কিনতে হবে।
এছাড়া বোর্ডটি যেন অতিরিক্ত গরম না হয় সে জন্য ছোট একটি ফ্যান বা হিটসিঙ্ক ব্যবহার করা ভালো। এটি আপনার বোর্ডের দীর্ঘস্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে এবং প্রসেসরকে ঠাণ্ডা রাখবে।
পুরো সেটআপটি করার জন্য আপনার হাতের কাছে একটি ইন্টারনেট সংযোগ থাকা জরুরি কারণ প্রথমবার সেটআপের সময় অনেক ফাইল ডাউনলোড করতে হয়।
আপনি চাইলে এগুলো আলাদা আলাদা না কিনে একটি স্টার্টার কিট হিসেবেও কিনতে পারেন যেখানে সব জিনিস একসাথে পাওয়া যায়।
আমি যখন প্রথমবার সেটআপ দিচ্ছিলাম তখন আমার কাছে কেবল একটি এসডি কার্ড ছিল না বলে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল।
তাই কেনার আগে একটি চেকলিস্ট মিলিয়ে নেওয়া ভালো যাতে কাজের মাঝখানে আপনাকে আর দৌড়াতে না হয়।
Raspberry Pi এ কোন সফটওয়্যার চলে?
Raspberry Pi এর নিজস্ব একটি অপারেটিং সিস্টেম আছে যার নাম হলো Raspberry Pi OS (আগে এর নাম ছিল রেস্পবিয়ান)।
এটি লিনাক্সের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে এবং এটি খুবই হালকা ও দ্রুতগতি সম্পন্ন। এতে ডিফল্ট হিসেবে ইন্টারনেট ব্রাউজার, অফিস সফটওয়্যার এবং কোডিং করার জন্য পাইথন টুলস দেওয়া থাকে।
এটি দেখতে অনেকটা উইন্ডোজের মতোই তাই ব্যবহার করতে আপনার খুব একটা সমস্যা হবে না। যারা একদম নতুন তাদের জন্য এটিই হবে সেরা পছন্দ।
তবে আপনি যদি একটু অ্যাডভান্সড হতে চান তবে এতে উবুন্টু বা কালি লিনাক্সও ইনস্টল করতে পারেন। বিশেষ করে যারা সাইবার সিকিউরিটি নিয়ে শিখতে চান তারা কালি লিনাক্স ব্যবহার করে অনেক প্র্যাকটিস করতে পারেন।
মজার ব্যাপার হলো মাইক্রোসফটও Raspberry Pi এর জন্য উইন্ডোজ আইওটি (IoT) কোর নামে একটি বিশেষ ভার্সন তৈরি করেছে।
যদিও এটি সাধারণ উইন্ডোজের মতো কাজ করে না বরং এটি মূলত কানেক্টেড ডিভাইস তৈরির জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী আপনি যেকোনো সময় অপারেটিং সিস্টেম বদলে নিতে পারেন।
সফটওয়্যার ইনস্টল করা এখন অনেক সহজ হয়ে গেছে কারণ Raspberry Pi ফাউন্ডেশন একটি ইমেজার টুল তৈরি করেছে।
এই টুলটি আপনার কম্পিউটারে ডাউনলোড করে এসডি কার্ডে খুব সহজেই ওএস রাইট করে দেয়। আমি যখন প্রথমবার ওএস দিচ্ছিলাম তখন অনেক কমান্ড টাইপ করতে হতো কিন্তু এখন সেটি মাত্র কয়েক ক্লিকেই হয়ে যায়।
লিনাক্স জগতটা খুব মজার আর Raspberry Pi সেই জগতে ঢোকার জন্য আপনার জন্য একটি ছোট দরজা মাত্র। একবার এর ব্যবহার শিখে গেলে আপনার আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না।
ভবিষ্যতে কেন Raspberry Pi শেখা জরুরি?
বর্তমান যুগ হলো অটোমেশন এবং ইন্টারনেট অফ থিংস বা IoT এর যুগ যেখানে সব ডিভাইস ইন্টারনেটের মাধ্যমে একে অপরের সাথে কথা বলবে।
Raspberry Pi হলো এই প্রযুক্তির মূল চালিকাশক্তি যা আপনাকে এই আধুনিক বিশ্বের জন্য প্রস্তুত করবে।
আপনি যখন এটি নিয়ে কাজ করবেন তখন আপনি কেবল হার্ডওয়্যার নয় বরং প্রোগ্রামিং, নেটওয়ার্কিং এবং লিনাক্স সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করবেন। এই দক্ষতাগুলো বর্তমানে চাকরির বাজারে অনেক বেশি মূল্যবান বিশেষ করে টেকনিক্যাল সেক্টরে।
ভবিষ্যতে আমাদের চারপাশের প্রায় সব কিছুই কোনো না কোনো ভাবে স্মার্ট ডিভাইসের সাথে যুক্ত থাকবে।
আপনি যদি এখন থেকেই Raspberry Pi ব্যবহার করে ছোট ছোট প্রজেক্ট করেন তবে আপনি সেই ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির পেছনের বিজ্ঞানটা বুঝে যাবেন।
এটি শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি বাড়াতে এবং সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা তৈরি করতে দারুণ সাহায্য করে।
বড় বড় কোম্পানিগুলো এখন এমন লোক খুঁজছে যারা শুধু কোডিং জানে না বরং হার্ডওয়্যারের সাথে তার সংযোগ ঘটাতে পারে। এই ছোট বোর্ডটি আপনাকে সেই মাল্টি-ট্যালেন্টেড মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
আমি অনেককে দেখেছি যারা বড় ক্যারিয়ার ছেড়ে এখন আইওটি নিয়ে কাজ করছেন কারণ এটাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
Raspberry Pi শেখা মানে হলো আপনি একটি নতুন ভাষা শিখছেন যা দিয়ে আপনি যন্ত্রের সাথে কথা বলতে পারবেন। আপনার বাসার এসির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে অফিসের কাজ অটোমেটিক করা পর্যন্ত সব কিছুই সম্ভব।
তাই এটি কেবল শখের বশেই নয় বরং একটি উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গড়ার লক্ষ্য নিয়ে শেখা শুরু করা উচিত। আপনার হাতের এই ছোট বোর্ডটিই হতে পারে আপনার সফলতার প্রথম ধাপ।
Raspberry Pi vs Arduino
প্রযুক্তি প্রেমীদের মধ্যে প্রায়ই একটি তর্কা বিতর্ক চলে যে তারা Raspberry Pi কিনবেন নাকি Arduino। আসলে এই দুটির কাজ সম্পূর্ণ আলাদা এবং এটি আপনাকে পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে।
Raspberry Pi হলো একটি পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার যাতে একটি অপারেটিং সিস্টেম চলে। অন্যদিকে Arduino হলো একটি মাইক্রোকন্ট্রোলার যা কেবল একটি নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
এটি অনেকটা এমন যে Raspberry Pi হলো একটি মাস্টারশেফ আর Arduino হলো একটি নির্দিষ্ট রেসিপির ওভেন।
যদি আপনার প্রজেক্টটি এমন হয় যেখানে জটিল হিসাব, ক্যামেরা প্রসেসিং বা ইন্টারনেটের সাথে বড় কোনো কানেকশন লাগবে তবে Raspberry Pi সেরা।
কিন্তু আপনি যদি খুব সাধারণ কোনো কাজ করতে চান যেমন একটি বাতি জ্বালানো বা তাপমাত্রা মাপা তবে আরডুইনোই যথেষ্ট। Arduino খুব কম বিদ্যুৎ খরচ করে এবং এটি বছরের পর বছর একই কাজ করে যেতে পারে।
কিন্তু Raspberry Pi তে অপারেটিং সিস্টেম থাকার কারণে একে কম্পিউটার শাটডাউন করার মতো প্রসেস মেনে বন্ধ করতে হয়।
একবার আমি একটি বুদ্ধিমান ট্রাফিক সিগন্যাল বানাতে চেয়েছিলাম যেখানে ক্যামেরা থাকবে। তখন আমি Raspberry Pi বেছে নিয়েছিলাম কারণ আরডুইনোর পক্ষে ভিডিও প্রসেসিং করা সম্ভব ছিল না।
আবার যখন ঘরের পানির ট্যাংকি ভরে গেলে এলার্ম বাজার প্রোজেক্ট করলাম তখন আমি Arduino ব্যবহার করেছিলাম কারণ সেখানে শক্তিশালী কম্পিউটারের দরকার ছিল না।
তাই আপনার উদ্দেশ্য কী তা আগে ঠিক করুন। যদি আপনি কম্পিউটার নিয়ে খেলতে চান তবে Raspberry Pi নিন আর যদি শুধু ইলেকট্রনিক্স সার্কিট নিয়ে কাজ করতে চান তবে Arduino ভালো।
প্রথম প্রজেক্ট হিসেবে কী শুরু করবেন?
আপনি যদি নতুন একটি Raspberry Pi হাতে পান তবে আপনার প্রথম কাজ হতে পারে একটি সাধারণ LED লাইট জ্বালানো।
এটি শুনতে সহজ মনে হলেও যখন আপনি নিজের লেখা কোড দিয়ে একটি লাইট জ্বলা বা নেভা নিয়ন্ত্রণ করবেন তখন অন্যরকম এক আনন্দ পাবেন। এটি আপনাকে GPIO পিন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেবে যা সব প্রজেক্টের প্রাণ।
এরপর আপনি একটি সেন্সর লাগিয়ে তাপমাত্রা মাপার যন্ত্র তৈরি করতে পারেন যা আপনার ঘরের বর্তমান তাপমাত্রা মনিটরে দেখাবে।
আরেকটি চমৎকার আইডিয়া হলো একটি মিডিয়া সার্ভার বানানো যা আমি আগেও বলেছি। আপনি ওপেনমিডিয়াভল্ট (OpenMediaVault) নামক সফটওয়্যার ব্যবহার করে আপনার পুরনো পেনড্রাইভ বা হার্ডড্রাইভকে একটি ক্লাউড স্টোরেজে রূপান্তর করতে পারেন। এর ফলে আপনার ফোনে স্টোরেজ শেষ হয়ে গেলেও আপনি নিজের বাসায় রাখা ড্রাইভে ফাইল সেভ করতে পারবেন।
এছাড়াও আপনি একটি ‘ম্যাজিক মিরর’ তৈরি করতে পারেন যা আপনার আয়নার ভেতর সময়, তারিখ এবং খবর দেখাবে। এটি বর্তমান সময়ে অনেক জনপ্রিয় একটি DIY প্রজেক্ট।
অনেকে আবার Raspberry Pi দিয়ে নিজের বাসার জন্য একটি অ্যাড-ব্লকার (Pi-hole) তৈরি করেন।
এটি নেটওয়ার্কের সব বিরক্তিকর বিজ্ঞাপন আটকে দেয় ফলে আপনার বাসার কোনো ডিভাইসেই আর বিজ্ঞাপন দেখা যাবে না।
এটি আপনার ইন্টারনেট ব্রাউজিং অভিজ্ঞতাকে অনেক বেশি শান্তিদায়ক করে তোলে। ছোট থেকে শুরু করুন এবং আস্তে আস্তে জটিলতার দিকে যান।
প্রতিটি প্রজেক্ট শেষে আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়বে এবং আপনি বড় কিছু করার অনুপ্রেরণা পাবেন। মনে রাখবেন শেখার কোনো শেষ নেই এবং প্রতিটি ভুল আপনাকে নতুন কিছু শেখাবে।
Raspberry Pi price in Bangladesh
আমাদের দেশে Raspberry Pi এর দাম আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে কারণ এতে ট্যাক্স এবং শিপিং চার্জ যুক্ত থাকে।
সাধারণত Raspberry Pi 4 বা 5 এর দাম ৪০০০ থেকে ৯০০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে যা এর র্যামের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে।
আপনি যদি সস্তায় পেতে চান তবে অনলাইনে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স শপ বা দারাজ এর মতো প্ল্যাটফর্মগুলো দেখতে পারেন।
তবে কেনার সময় অবশ্যই দেখে নেবেন সেটি আসল প্রোডাক্ট কি না কারণ বাজারে অনেক সময় ক্লোন বোর্ড পাওয়া যায়।
পুরান ঢাকার নবাবপুর বা বিভিন্ন বড় ইলেকট্রনিক্স মার্কেটেও আপনি এগুলো খুঁজে পেতে পারেন তবে অনলাইনে কেনাটাই বেশি সুবিধাজনক।
বর্তমানে অনেক দেশি টেক শপ এগুলো সরাসরি ইমপোর্ট করে তাই আপনি ওয়ারেন্টিসহ ভালো বোর্ড পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবেন।
শুধু বোর্ড না কিনে আমি সবসময় একটি কম্বো প্যাক কেনার পরামর্শ দিই কারণ এতে আপনি অরিজিনাল অ্যাডাপ্টার এবং কেস পাবেন যা বোর্ডের সুরক্ষার জন্য খুব জরুরি।
আমাদের দেশে অনেক কমিউনিটি গ্রুপ আছে যেখানে আপনি সেকেন্ড হ্যান্ড বোর্ডও খুঁজে পেতে পারেন যদি আপনার বাজেট কম থাকে।
দামের পাশাপাশি আপনার মাথায় রাখা উচিত এটি দিয়ে আপনি কত টাকা সাশ্রয় করছেন। একটি ডেক্সটপ কম্পিউটার কিনতে যেখানে ৩০-৪০ হাজার টাকা লাগে সেখানে ১০ হাজার টাকার সেটআপ দিয়ে আপনি লিনাক্স আর প্রোগ্রামিং এর কাজগুলো অনায়াসেই করতে পারছেন।
এটি দীর্ঘমেয়াদী একটি বিনিয়োগ যা আপনার স্কিল ডেভেলপ করতে সাহায্য করবে।
আমাদের দেশে এখন অনেক ল্যাবরেটরি এবং স্কুলে এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে যা ইতিবাচক একটি দিক। তাই বাজেট কিছুটা বেশি মনে হলেও এর উপযোগিতা অনেক বেশি।
Raspberry Pi শেখার সঠিক গাইডলাইন বা রোডম্যাপ
Raspberry Pi শেখার প্রথম ধাপ হলো লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেমের সাথে পরিচিত হওয়া। যেহেতু এটি মূলত কমান্ডের ওপর ভিত্তি করে চলে তাই আপনার কিছু বেসিক কমান্ড যেমন ফাইল তৈরি করা বা ডিরেক্টরি পরিবর্তন করা শিখতে হবে।
ইন্টারনেটে অনেক ফ্রি টিউটোরিয়াল পাওয়া যায় যা আপনাকে লিনাক্স টার্মিনাল ব্যবহারে দক্ষ করে তুলবে। ঘাবড়ানোর কিছু নেই এটি চর্চা করলে খুব দ্রুতই আয়ত্তে চলে আসে।
এরপর আপনাকে পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষাটির ওপর কিছুটা দখল আনতে হবে কারণ অধিকাংশ প্রোজেক্ট এই ভাষায় লেখা হয়।
দ্বিতীয় ধাপে আপনি GPIO পিনগুলোর ব্যবহার শিখবেন। কিভাবে একটি পিন থেকে পাওয়ার আউটপুট নিতে হয় এবং কিভাবে ইনপুট সিগন্যাল নিতে হয় তা বুঝলেই আপনি সেন্সর নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
ইউটিউবে অনেক চ্যানেল আছে যারা হাতে কলমে এগুলো শেখায়। ছোট ছোট সার্কিট ডিজাইন করা এবং সেগুলোকে কোডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা শিখলে আপনি অনেক বড় বড় প্রজেক্টে হাত দিতে পারবেন।
এই পর্যায়ে আপনি নেটওয়ার্কিং নিয়ে কিছুটা পড়াশোনা করতে পারেন যাতে ডিভাইসগুলোকে রিমোটলি কন্ট্রোল করা যায়।
সবশেষে আপনি নিজের আইডিয়াগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করুন। হয়তো আপনি এমন কিছু বানাতে চাইছেন যা আগে কেউ করেনি সেখানেই আপনার আসল পরীক্ষা।
ইন্টারনেটে Raspberry Pi এর একটি বিশাল কমিউনিটি আছে যারা সব সময় সাহায্য করতে প্রস্তুত। আপনার যদি কোনো সমস্যা হয় বা কোডে ভুল থাকে তবে ফোরামগুলোতে পোস্ট করলে আপনি দ্রুত সমাধান পেয়ে যাবেন।
ধৈর্য হারাবেন না কারণ প্রোগ্রামিং এবং হার্ডওয়্যার একসাথে সামলানো একটু কঠিন কিন্তু একবার শিখে গেলে এটি আপনাকে অনেক আনন্দ দেবে।
নতুনরা যেসব ভুল করে এবং যা থেকে দূরে থাকা উচিত
Raspberry Pi ব্যবহার করতে গিয়ে নতুনরা সবচেয়ে বড় যে ভুলটি করে তা হলো ভুল Power Supply ব্যবহার করা।
অনেকে মনে করেন যে কোনো চার্জার দিয়ে এটি চললে বোধহয় হবে কিন্তু কম ভোল্টেজের কারণে আপনার মেমোরি কার্ড করাপ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে আপনার সব কষ্ট করে করা প্রোজেক্ট মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তাই সবসময় ভালো মানের ৫ ভোল্ট এবং ৩ অ্যাম্পিয়ারের পাওয়ার অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন। এটি আপনার কম্পিউটারের স্ট্যাবিলিটি নিশ্চিত করবে।
আরেকটি সাধারণ সমস্যা হলো SD card এ ভুলভাবে অপারেটিং সিস্টেম রাইট করা। অনেকে শুধু ফাইল কপি করে পেস্ট করে দেন কিন্তু এভাবে ওএস চলে না। আপনাকে অবশ্যই ফ্ল্যাশিং সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হবে।
এছাড়া বোর্ডটি চলাকালীন কোনো মেটাল সারফেসের ওপর রাখবেন না কারণ এতে শর্ট সার্কিট হয়ে বোর্ডটি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সব সময় একটি প্লাস্টিক বা এক্রাইলিক কেস ব্যবহার করা নিরাপদ।
আমি শুরুতে কেস ছাড়াই ব্যবহার করতাম এবং একবার আমার বোর্ডটি টেবিলের চাবিতে লেগে সামান্য ড্যামেজ হয়েছিল।
কাজের সময় তাড়াহুড়ো করে GPIO পিনে তার লাগানো যাবে না। পিনগুলো খুব সেনসিটিভ এবং উল্টো কানেকশন দিলে প্রসেসর জ্বলে যেতে পারে।
কানেকশন দেওয়ার আগে ডায়াগ্রাম ভালো করে দেখে নিন। অনেক সময় দেখা যায় সিস্টেম আপডেট না দেওয়ার কারণে সফটওয়্যার কাজ করে না তাই নিয়মিত ইন্টারনেটে কানেক্ট করে আপডেট করে নেওয়া ভালো।
ধৈর্য ধরুন এবং প্রতিটি পদক্ষেপে সতর্ক থাকুন কারণ ছোট একটি অসাবধানতা আপনার শখের যন্ত্রটি নষ্ট করে দিতে পারে।
4 Frequently Asked Questions about Raspberry Pi
Raspberry Pi কি ল্যাপটপের জায়গা নিতে পারবে?
সত্যি বলতে সাধারণ ব্রাউজিং বা টাইপিং এর কাজের জন্য এটি ল্যাপটপের বিকল্প হতে পারে কিন্তু ভারি গেম খেলা বা ভিডিও এডিটিং করার জন্য এটি উপযুক্ত নয়। এটি মূলত একটি লার্নিং টুল এবং সার্ভার হিসেবে কাজ করার জন্য বানানো হয়েছে। আপনি একে সেকেন্ডারি কম্পিউটার হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন যা সবসময় চালু থাকবে।
ইন্টারনেট ছাড়া কি Raspberry Pi চালানো সম্ভব?
হ্যাঁ একদম সম্ভব। আপনি অফলাইনেও এতে প্রোগ্রামিং করতে পারেন বা মুভি দেখতে পারেন। তবে নতুন কোনো সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে বা আপডেট দিতে হলে আপনার ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন হবে। একবার সেটআপ হয়ে গেলে এটি ছাড়াই এটি কাজ করতে পারে।
কোডিং না জানলে কি আমি Raspberry Pi কিনতে পারি?
অবশ্যই পারেন! এটি কেনাই হয় কোডিং শেখার জন্য। অনেক ইউজার আছেন যারা শুধু গান শোনার জন্য বা টিভি বক্স হিসেবে এটি ব্যবহার করেন যেখানে খুব একটা কোডিং লাগে না। তবে আপনি যদি এর আসল মজা পেতে চান তবে একটু আধটু কোডিং শেখা আপনার জন্য ভালো হবে।
Raspberry Pi দিয়ে কি উইন্ডোজ ১০ বা ১১ চালানো যায়?
সরাসরি নয়। Raspberry Pi তে সাধারণ উইন্ডোজ চলে না কারণ এর প্রসেসর আর্কিটেকচার আলাদা। তবে কিছু কাস্টম পদ্ধতি আছে যা দিয়ে উইন্ডোজ চালানোর চেষ্টা করা হয় কিন্তু তা খুব একটা স্মুথ হয় না। তাই এর জন্য লিনাক্সই সেরা।

