পাঁচ হাজার টাকায় স্মার্ট বাড়ি — তানভীর ভাইয়ের Raspberry Pi প্রজেক্ট

আমাদের পাড়ার শেষ মাথায় হাবিব চাচার বাড়ি। চাচার বড় ছেলে তানভীর ভাই এবার ইন্টার পাস করে ঢাকায় পলিটেকনিকে ভর্তি হইছে। ঈদের ছুটিতে বাড়ি আসছে। সাথে নিয়ে আসছে একটা ছোট্ট কম্পিউটারের মতো বোর্ড।
আমি হাবিব চাচার বাড়িতে গেছিলাম আম খেতে। উঠানে ঢুকতেই দেখলাম তানভীর ভাই বারান্দায় বসে অনেক তার নিয়ে কাজ করছে। কাছে গেলাম। জিজ্ঞেস করলাম ভাই এইটা কি করছেন?
তানভীর ভাই হাসলো। বললো পুরো বাড়িকে স্মার্ট বানাচ্ছি। ফোন দিয়ে লাইট ফ্যান সব চালু বন্ধ করা যাবে! আমি তো অবাক হয়ে মুখ হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমার কাছে মনে হয় তানভীর ভাই অনেক অনেক মেধাবী।
Raspberry Pi জিনিসটা কি
তানভীর ভাই ওই ছোট বোর্ডটা আমার হাতে দিলো। বললো এইটার নাম Raspberry Pi। এইটা একটা পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার। কিন্তু সাইজ একটা ক্রেডিট কার্ডের মতো!
আমি বললাম এত ছোট কম্পিউটার দিয়ে কি হবে? তানভীর ভাই বললো এইটা দিয়ে পুরো বাড়ির লাইট ফ্যান এসি সব একসাথে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। বাইরে থেকেও। মানে ঢাকায় বসে থেকেও গ্রামের বাড়ির লাইট বন্ধ করা যাবে!
হাবিব চাচা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনলেন। বললেন এইটা কিনতে কত লাগছে বাবা? তানভীর ভাই বললেন বেশি না আব্বা। পুরো সিস্টেম মিলিয়ে পাঁচ ছয় হাজারের মধ্যে হয়ে যাবে। চাচা বললেন বাহ! বাজারের দামী জিনিস কেনার চেয়ে ঢের ভালো।
কেন Raspberry Pi ভালো
তানভীর ভাই বোঝালো। বললো বাজারে অনেক স্মার্ট বাল্ব পাওয়া যায়। কিন্তু প্রতিটার জন্য আলাদা আলাদা অ্যাপ। আলাদা আলাদা কোম্পানি।
Raspberry Pi হলো সেই কেন্দ্রীয় মস্তিষ্ক যে সব কিছু একসাথে চালায়। যে কোনো ব্র্যান্ডের ডিভাইস একসাথে কানেক্ট করা যায়। মানে একটা অ্যাপ দিয়েই সব।
আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো এইটা ২৪ ঘণ্টা চালু রাখলেও বিদ্যুৎ খরচ অনেক কম। তানভীর ভাই বললো এইটা অনেকটা একজন বুদ্ধিমান ম্যানেজারের মতো। সব দিক সামলায়।
কি কি লাগবে
তানভীর ভাই টেবিলে সব জিনিস সাজিয়ে রেখেছিল। আমি দেখলাম।
Raspberry Pi 4 লাগবে। এইটা মূল কম্পিউটার। মাইক্রো SD কার্ড লাগবে। এইখানে অপারেটিং সিস্টেম থাকবে। পাওয়ার অ্যাডাপ্টার লাগবে। ভালো মানের কিনতে হবে। সস্তা চার্জার দিলে বারবার বন্ধ হয়ে যায়।
Relay Module লাগবে। এইটা সুইচের কাজ করে। এইটা দিয়ে লাইট ফ্যান অন অফ করা যাবে। Motion Sensor লাগবে। এইটা মানুষ আছে কিনা বুঝতে পারে। Temperature Sensor লাগবে। তাপমাত্রা মাপবে। Door Sensor লাগবে। দরজা খুললে বুঝবে। জাম্পার তার আর ব্রেডবোর্ড লাগবে।
তানভীর ভাই বললো শুরুতে সব কেনার দরকার নেই। মাত্র দুইটা Relay আর একটা Temperature Sensor দিয়ে শুরু করো। বাকিটা পরে যোগ করো।
হাবিব চাচা শুনলেন। বললেন বাজারে দামী সিকিউরিটি সিস্টেম লাগাতে গেলে দশ হাজারের উপরে লাগতো। ছেলে নিজেই বানাইছে। গর্ব লাগছে।
অপারেটিং সিস্টেম কিভাবে লাগালো
তানভীর ভাই বললো প্রথম কাজ হলো Raspberry Pi OS লাগানো। এইটা লিনাক্স ভিত্তিক। এইটা লাগানো এখন অনেক সহজ।
ল্যাপটপে Raspberry Pi Imager নামাতে হবে। তারপর SD কার্ড লাগিয়ে অপারেটিং সিস্টেম সিলেক্ট করে Write বাটন চাপলেই হয়। তানভীর ভাই বললো এইটা অনেকটা ফোনে মেমোরি কার্ড ঢোকানোর মতোই সহজ।
একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বললো। Static IP সেট করতে হবে। মানে Raspberry Pi এর ঠিকানা সবসময় এক রাখতে হবে। না করলে রাউটার রিস্টার্ট দিলে সিস্টেম কাজ করা বন্ধ করে দেয়।
তানভীর ভাই বললো সে প্রথমবার এই ভুল করছিল। রাউটার বন্ধ করলেই সব বন্ধ হয়ে যেতো। পরে বুঝলো। Static IP সেট করতেই সব ঠিক হলো।
Home Assistant কেন দরকার
তানভীর ভাই বললো Raspberry Pi তে একটা সফটওয়্যার থাকে। সেইটার নাম Home Assistant। এইটাই আসল মজার জিনিস।
এইটা দিয়ে একটা সুন্দর কন্ট্রোল প্যানেল বানানো যায়। লাইট বন্ধ করার বাটন। ফ্যান চালু করার বাটন। তাপমাত্রা দেখার জায়গা। সব এক জায়গায়।
আর সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো সব তথ্য বাড়ির ভেতরেই থাকে। ইন্টারনেটে বা অন্য কোম্পানির সার্ভারে যায় না। প্রাইভেসি নিরাপদ।
তানভীর ভাই বললো তার এক বন্ধুর ফোনে পাঁচটা আলাদা আলাদা স্মার্ট হোম অ্যাপ ছিল। Home Assistant লাগানোর পর এখন একটাই অ্যাপ। সব ডিভাইস এক জায়গা থেকে কন্ট্রোল। আমি মনে মনে ভাবলাম কি মজার ব্যাপার!
তার কিভাবে লাগালো

তানভীর ভাই বললো Raspberry Pi এর গায়ে অনেক ছোট ছোট পিন আছে। এইগুলোকে GPIO পিন বলে। এইগুলো দিয়েই সব কিছু কানেক্ট হয়।
Relay লাগানোর সময় তিনটা তার লাগে। VCC পিন মানে পাওয়ার। GND মানে গ্রাউন্ড। IN পিন মানে সিগন্যাল।
Raspberry Pi এর ৫ ভোল্ট পিন থেকে Relay এর VCC তে তার দিলো। GPIO পিন ১৮ থেকে Relay এর IN পিনে তার দিলো। দুইটার GND একসাথে জুড়লো।
তানভীর ভাই বললো তার গোছানোর সময় রঙ মিলিয়ে কাজ করবে। লাল তার পাওয়ারের জন্য। কালো তার গ্রাউন্ডের জন্য। তাহলে পরে বুঝতে সুবিধা হবে।
একটা কথা সাবধান করলো। বাসার ২২০ ভোল্টের লাইনে কাজ করার সময় মেইন সুইচ বন্ধ করতে হবে। নাহলে বিপদ হতে পারে। নিরাপত্তা আগে তারপর প্রযুক্তি।
কোড কিভাবে লিখলো
তানভীর ভাই বললো এই সিস্টেমে Python ভাষায় কোড লিখতে হয়। কিন্তু ভয়ের কিছু নাই। কোড অনেক ছোট।
import RPi.GPIO as GPIO
import time
# পিন মোড সেট করা
GPIO.setmode(GPIO.BCM)
GPIO.setup(18, GPIO.OUT)
# লাইট জ্বালানো এবং নেভানোর লজিক
try:
while True:
GPIO.output(18, GPIO.HIGH) # লাইট অন
print("লাইট এখন জ্বলছে")
time.sleep(2) # ২ সেকেন্ড অপেক্ষা
GPIO.output(18, GPIO.LOW) # লাইট অফ
print("লাইট এখন বন্ধ")
time.sleep(2)
except KeyboardInterrupt:
GPIO.cleanup() # কোড বন্ধ করলে পিন পরিষ্কার করাতানভীর ভাই বোঝালো। RPi.GPIO হলো সেই লাইব্রেরি যা পিনগুলো চিনতে সাহায্য করে। GPIO.setmode(GPIO.BCM) মানে BCM পদ্ধতিতে পিন চেনা। GPIO.setup(18, GPIO.OUT) মানে পিন ১৮ আউটপুট হিসেবে সেট করা।
GPIO.HIGH মানে বিদ্যুৎ পাঠাও মানে লাইট জ্বালাও। GPIO.LOW মানে বিদ্যুৎ বন্ধ করো মানে লাইট নিভাও। time.sleep(2) মানে ২ সেকেন্ড অপেক্ষা করো।
তানভীর ভাই বললো এই কোড চালালে প্রতি ২ সেকেন্ডে লাইট জ্বলবে নিভবে। এইখানে সেন্সর যোগ করলে লাইট নিজে থেকেই বুদ্ধিমত্তার সাথে কাজ করবে।
তানভীর ভাই সাবধান করলো একটা ভুলের কথা বললো। সে একবার পিন ১৮ এর জায়গায় পিন ৮ দিয়েছিল কোডে। কিছুই কাজ করেনি। পরে মিলিয়ে দেখলো ভুল। তাই কোডের পিন নম্বর আর আসল পিন নম্বর সবসময় মিলিয়ে দেখতে হবে।
সেন্সর কিভাবে কাজ করে
তানভীর ভাই বললো সেন্সর হলো সিস্টেমের চোখ আর কান।
Motion Sensor মানুষ আছে কিনা বোঝে। রুমে কেউ না থাকলে লাইট নিজে বন্ধ হয়ে যাবে। কেউ ঢুকলেই জ্বলে উঠবে। বিদ্যুৎ বাঁচবে।
Temperature Sensor তাপমাত্রা মাপে। ৩০ ডিগ্রির বেশি হলে ফ্যান নিজে চালু হয়ে যাবে।
Door Sensor দরজা খোলা বন্ধ বোঝে। দুইটা ছোট চুম্বক দরজায় লাগানো থাকে। দরজা খুললে চুম্বক আলাদা হয়। Raspberry Pi টের পায়। ফোনে নোটিফিকেশন আসে।
তানভীর ভাই বললো সে তার নিজের বাসায় পানির ট্যাংকে সেন্সর লাগাইছে। ট্যাংক ভরে গেলে মোটর নিজে বন্ধ হয়ে যায়। আগে পানি উপচে পড়তো। এখন আর হয় না।
আমি ভাবলাম কি মজার ব্যাপার। এত ছোট ছোট কাজ কিন্তু জীবন কত সহজ হয়ে যায়!
মোবাইল দিয়ে বাইরে থেকে চালানো যাবে
তানভীর ভাই বললো এইটা সবচেয়ে মজার অংশ। ঢাকায় বসে গ্রামের বাড়ির গিজার চালু করা যাবে।
DuckDNS নামে একটা সার্ভিস আছে। এইটা দিয়ে বাসার ভেতরের সিস্টেমকে ইন্টারনেটের সাথে কানেক্ট করা যায়। সব এনক্রিপ্টেড। হ্যাকিং এর ভয় নেই।
তারপর Home Assistant এর অ্যাপ ফোনে নামাতে হবে। ব্যস। যেখানেই থাকো বাড়ির লাইট ফ্যান সব কন্ট্রোল করা যাবে।
তানভীর ভাই বললো আরেকটা মজার ফিচার আছে। Geofencing। মানে তুমি বাসার ৫০০ মিটারের মধ্যে আসলে সিস্টেম বুঝতে পারবে। নিজে থেকে গেট খুলবে। এসি চালু করবে।
হাবিব চাচা এইটা শুনে বললেন বাবা এইটা কি সত্যি হয়? তানভীর ভাই বললেন হ্যাঁ আব্বা। এইটাই আধুনিক প্রযুক্তি। চাচা হাসলেন।
নিরাপত্তার কথা
তানভীর ভাই গম্ভীর হলো। বললো একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি।
Raspberry Pi যদি ইন্টারনেটে থাকে তাহলে ভালো পাসওয়ার্ড দিতে হবে। ডিফল্ট পাসওয়ার্ড কখনো রাখবে না। ডিফল্ট পাসওয়ার্ড দিলে যে কেউ ঢুকে যেতে পারবে।
Two-Factor Authentication চালু রাখতে হবে। মানে পাসওয়ার্ড জানলেও ফোনে আসা কোড ছাড়া ঢোকা যাবে না।
আর নিয়মিত ব্যাকআপ নিতে হবে। তানভীর ভাই বললো সে একবার ব্যাকআপ না রাখার কারণে তিন মাসের কাজ হারিয়ে ফেলেছিল। SD কার্ড নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সব শেষ।
এখন Home Assistant এ গুগল ড্রাইভে অটোমেটিক ব্যাকআপ হয় প্রতিদিন। আর মাঝে মাঝে Raspberry Pi এর ধুলো পরিষ্কার করতে হবে। বেশি গরম হলে ফ্যান লাগিয়ে নিতে হবে।
আরো কি কি করা যাবে
তানভীর ভাই বললো এইটা আরো অনেক বড় করা যাবে।
ক্যামেরা লাগালে AI দিয়ে মুখ চেনা যাবে। পরিচিত কেউ দরজায় আসলে ফোনে নাম বলে নোটিফিকেশন আসবে। Smart Mirror বানানো যাবে। আয়নায় ভেসে উঠবে আজকের আবহাওয়া ক্যালেন্ডারের কাজ নিউজ।
সোলার প্যানেল কানেক্ট করলে কতটুকু বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে সেইটা দেখা যাবে। নিজের ভয়েস কন্ট্রোল বানানো যাবে। কথা বললেই লাইট জ্বলবে। কিন্তু তথ্য কোনো বড় কোম্পানির কাছে যাবে না।
আর Raspberry Pi দিয়ে Mini WiFi Server বানানো যায়। তানভীর ভাই বললো সামনে এইটাও বানাবে।
আমি ভাবলাম এইটা তো শেষই নাই। যত শিখবে তত নতুন আইডিয়া আসবে।
চালু হলো যখন
তানভীর ভাই সব লাগানো শেষ করলো। কোড চালু করলো।
ফোনে Home Assistant অ্যাপ খুললো। লাইট অন বাটন চাপলো।
বারান্দার লাইট জ্বলে উঠলো!
হাবিব চাচা দেখলেন। বললেন সুবহানাল্লাহ! ফোন দিয়ে লাইট জ্বললো! তানভীর ভাই হাসলো।
তারপর Motion Sensor চেক করলো। তানভীর ভাই সামনে দিয়ে হাঁটলো। লাইট জ্বলে উঠলো। সরে গেলো। কিছুক্ষণ পর লাইট নিজে নিভে গেলো!
আমি চিৎকার দিলাম। অনেক অনেক মজা লাগলো! পাড়ার অন্য বাচ্চারাও এসে গেলো দেখতে। সবাই অবাক।
শেষে বলি
সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার সময় তানভীর ভাই বললো একটা কথা। বললো ছোট ছোট ভুল হবেই। সেই ভুল থেকে শেখো। আমরা সব বড় বড় আবিষ্কার একটা ছোট আইডিয়া থেকেই শুরু হয়েছিল।
হাবিব চাচা বললেন আমার ছেলে পলিটেকনিকে পড়ে কিন্তু গ্রামের বাড়িতে এসে এত বড় কাজ করলো। গর্ব লাগছে।
আমি মনে মনে ঠিক করলাম বড় হলে আমিও এইরকম কিছু বানাবো। আমাদের বাড়িটাও স্মার্ট করবো।
তাই আমার মনে হয় সবার একবার এই Home Automation System বানানো উচিত। নিজের বাড়ি নিজে স্মার্ট করো। টাকা বাঁচবে। অনেক কিছু শেখাও হবে!
