রাত তখন প্রায় দুইটা। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু আমি বারান্দায় বসে আছি, হাতে মুঠোফোনের আলো, চোখ আটকে আছে একটা প্লাস্টিকের ট্যাংকের দিকে। ভেতর থেকে পানির গুড়গুড় শব্দটা আসছে না।
কারণ এয়ার পাম্পটা বন্ধ। বিদ্যুৎ চলে গেছে প্রায় দুই ঘণ্টা আগে, আর জেনারেটরটাও সেদিন ঠিকমতো কাজ করছিল না। বুকের ভেতর একটা চিনচিনে ভয় কাজ করছিল — মাছগুলো বেঁচে থাকবে তো?
পরদিন সকালে যখন ট্যাংকের ঢাকনা খুললাম, প্রায় অর্ধেক মাছ উপরে ভেসে আছে। সেই দৃশ্যটা আজও চোখে লেগে আছে।
এই লেখাটা আসলে সেই রাতের ঘটনা থেকেই শুরু হওয়া উচিত, কারণ আমার পুরো গল্পটাই সেখান থেকে মোড় নিয়েছিল।
আমি বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করেছি নিজের হাতে, নিজের জমানো টাকায়, আর নিজের অনেক ভুলের মধ্য দিয়ে। প্রথমবার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছিলাম। মন ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু থেমে যাইনি।
আবার দাঁড়িয়েছি, আর এবার একটু হলেও ভালো করেছি। এই অভিজ্ঞতাটাই লিখে রাখতে চাইছি, যাতে আপনার মতো কেউ একটু কম হোঁচট খেয়ে এগিয়ে যেতে পারেন।
আপনি যদি ভাবছেন বায়োফ্লকে নামবেন, নাকি পুকুরেই মাছ চাষ চালিয়ে যাবেন — এই লেখাটা ঠিক আপনার জন্যই লিখছি।
এই গল্প শুরু হয়েছিল প্রায় দুই বছর আগে। চাকরি ছিল, কিন্তু মাস শেষে বেতনে সংসার ঠিকঠাক চলছিল না। পাশের বাড়ির একজন তার ছাদের ট্যাংকে বায়োফ্লকে মাছ বড় করছিলেন, একদিন গিয়ে দেখেও এলাম।
সেদিনই মাথায় ঢুকেছিল, এটা করা যায়। পুকুর কেনার মতো জমিও ছিল না হাতে, তাই বায়োফ্লকই তখন একমাত্র রাস্তা মনে হয়েছিল।
বায়োফ্লক ব্যাপারটা আসলে কী
নামটা শুনতে যতটা কঠিন লাগে, কাজটা আসলে তেমন জটিল না। বায়োফ্লকে মাটির পুকুর লাগে না। বড় একটা ট্যাংকে — সেটা সিমেন্টের রিং ট্যাংক হতে পারে, বা ত্রিপলের তৈরি গোল ট্যাংক — মাছ রাখা হয়।
পানির ভেতর কিছু উপকারী জীবাণু তৈরি করে দেওয়া হয়, যাদের কাজ হলো মাছের মলমূত্র আর বাড়তি খাবার খেয়ে এক রকম প্রোটিনের দানা বানানো।
মাছ সেই দানা খেয়েও কিছুটা বেড়ে ওঠে। এতে খাবারের খরচ একটু কমে, আর পানি বদলানোর প্রয়োজনও কমে যায়।
কিন্তু এই জীবাণুদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে পানিতে সব সময় অক্সিজেন দিতে হয়, এয়ার পাম্প বা ব্লোয়ার চালিয়ে।
এটা ঠিক রান্নার মতো একটা ব্যাপার — চুলার আগুন একবার নিভে গেলে যেমন পুরো রান্নাটাই বিগড়ে যায়, এখানেও এয়ার পাম্প বন্ধ হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পানির অক্সিজেন শেষ হয়ে যায়, আর মাছ মরতে শুরু করে। আমার সেই রাতের ঘটনাটা ঠিক এই কারণেই হয়েছিল।
সাধারণত বায়োফ্লকে কই, শিং, মাগুর, তেলাপিয়ার মতো মাছ চাষ করা হয়, কারণ এরা ঘন পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারে।
আর পানির ভারসাম্য রাখতে চিটাগুড় দিতে হয়, যাতে পানির ভেতরের রাসায়নিক অনুপাতটা ঠিক থাকে — এই শব্দটা শুনে ভয় পাবেন না, আসলে ব্যাপারটা হলো পানির ভেতরের একটা ভারসাম্য, যেটা কয়েকদিন করতে করতেই হাতে এসে যায়।
বায়োফ্লকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জায়গা কম লাগে, আর একই জায়গায় পুকুরের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি মাছ রাখা যায়।
যাদের বড় জমি নেই, ছাদে বা বাড়ির পেছনে একটু খালি জায়গা আছে, তাদের জন্য এটা সত্যিই একটা সুযোগ। কিন্তু এই সুবিধার সাথে একটা শর্তও জুড়ে আছে — বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি আর নিয়মিত নজরদারি। একদিন অবহেলা করলেই বিপদ চলে আসতে পারে।
সাধারণত বায়োফ্লকে এক চক্রে মাছ বিক্রির উপযোগী হতে চার থেকে পাঁচ মাস সময় লাগে, প্রজাতি আর পরিচর্যার ওপর নির্ভর করে এটা একটু কমবেশি হতে পারে।
দিনে দুই থেকে তিনবার খাবার দিতে হয়, আর সপ্তাহে অন্তত একদিন পানির অবস্থা যাচাই করতে হয়। এই নিয়মটা মানতে পারলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়, না মানলেই আমার মতো বিপদ ডেকে আনতে হয়।
পুকুরের চাষ — যা সবার চেনা
আমাদের গ্রামে পুকুরে মাছ চাষ নতুন কিছু না, দাদার আমল থেকে চলে আসছে। একটা পুকুর, কিছু পোনা ছেড়ে দেওয়া — রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙ্গাস মিশিয়ে — মাঝে মাঝে খাবার দেওয়া, আর বাকি কাজ প্রকৃতির হাতে ছেড়ে দেওয়া।
বৃষ্টির পানি, রোদ, পুকুরের তলার মাটি, সবকিছু মিলিয়ে মাছ বড় হতে থাকে, প্রায় নিজের নিয়মে।
পুকুরে বিদ্যুৎ না থাকলেও মাছ মরে না, এটাই সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা। প্রকৃতি নিজেই একটা অক্সিজেনের ভারসাম্য রাখে।
কিন্তু এর মানে এই না যে পুকুর চাষে কোনো ঝুঁকি নেই। বড় বৃষ্টিতে পুকুর ভেসে গিয়ে মাছ বেরিয়ে যায়, রাতে মাছ চোর হানা দেয়, বক বা মেছোবিড়াল মাছ খেয়ে যায়, কখনো পানির রং বদলে রোগ লেগে যায় — এসবও আমি কম দেখিনি, কারণ আমার মামার পুকুরেই এসব ঘটতে দেখেছি ছোটবেলা থেকে।
পুকুরে মাছের ঘনত্ব কম রাখতে হয়, কারণ জায়গা আর প্রাকৃতিক অক্সিজেনের একটা সীমা থাকে। তাই একই জায়গায় বায়োফ্লকের মতো এত মাছ একসাথে রাখা যায় না, ফলে মাছ বড় হতেও সময় লাগে বেশি।
কিন্তু এই ধীর গতির মধ্যেও একটা শান্তি আছে — রোজ রোজ যন্ত্র নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হয় না, রাতে এয়ার পাম্প বন্ধ হয়ে যাবে কিনা সেই ভয়ে ঘুম ভাঙে না।
পুকুরে সাধারণত বছরে একবার বা দুবার পোনা ছাড়া হয়, আর মাছ বড় হতে আট থেকে বারো মাস বা তার বেশি সময় লেগে যায়, প্রজাতির ওপর নির্ভর করে।
আমার মামা প্রতি বছর শীতের আগে পুকুর শুকিয়ে পরিষ্কার করেন, তারপর নতুন পোনা ছাড়েন। এই পুরো ব্যাপারটা একটা উৎসবের মতো লাগে, আশেপাশের লোকজন এসে দেখে, কথা বলে, একটা মিলনমেলার মতো পরিবেশ তৈরি হয়।
বায়োফ্লকে এই সামাজিক ব্যাপারটা কম, কারণ কাজটা একা একা, ঘরের কাছে, নিজের মতো করে করতে হয়।
আমার প্রথম ভুলটা যেখানে হয়েছিল
শুরুতে আমি ভেবেছিলাম, বায়োফ্লক মানে শুধু একটা ট্যাংক বসিয়ে মাছ ছেড়ে দেওয়া। ইউটিউবে কয়েকটা ভিডিও দেখে মনে হয়েছিল কাজটা সহজ।
একটা ত্রিপলের ট্যাংক বানালাম, এয়ার পাম্প লাগালাম, কই মাছের পোনা ছাড়লাম প্রায় হাজারখানেক। প্রথম কয়েকদিন সব ঠিকঠাক চলছিল, মনে হচ্ছিল আমি ঠিক পথেই আছি, প্রতিদিন সকালে উঠে ট্যাংকের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম এক রকম গর্ব নিয়ে।
কিন্তু আসল ভুলটা ছিল, আমি পানির পরীক্ষা করতাম না। অ্যামোনিয়া কতটুকু বেড়েছে, পানির গুণমান কতটা বদলেছে, এসব মাপার কোনো অভ্যাসই ছিল না।
শুধু চোখে দেখতাম পানি ঘোলা হয়েছে কিনা, আর সেটাকেই যথেষ্ট মনে করতাম। তার ওপর জেনারেটরের কোনো ব্যবস্থা না রেখে শুধু লাইনের বিদ্যুতের ওপর ভরসা করে বসেছিলাম, যেন বিদ্যুৎ কখনো যাবেই না।
যেদিন বিদ্যুৎ গেল, সেদিনই বুঝলাম, প্রকৃতির সাথে এই খেলায় অলসতার কোনো জায়গা নেই।
সেই রাতে অর্ধেক মাছ মরে যাওয়ার পর কয়েকদিন ভীষণ মন খারাপ ছিল। মনে হয়েছিল এই কাজ আমার জন্য না।
বাড়ির লোকজনও বলেছিল, এসব ছেড়ে দাও, পুকুরেই যা হয় হোক, শান্তিতে থাকো। কিন্তু কোথাও একটা জেদ কাজ করছিল, হারিয়ে দিয়ে চলে যাওয়াটা মানতে পারিনি।
দ্বিতীয়বার শুরু করার আগে কয়েকটা জিনিস বদলে ফেললাম। একটা ছোট পানি পরীক্ষার কিট কিনলাম, সপ্তাহে দুদিন পানি মেপে দেখার অভ্যাস করলাম।
একটা ব্যাটারি ব্যাকআপ এয়ার পাম্প রাখলাম, যেটা বিদ্যুৎ গেলেও কয়েক ঘণ্টা চলতে পারে। আর সবচেয়ে বড় কথা, মাছের ঘনত্ব কমিয়ে দিলাম, প্রথমবারের মতো লোভ করে বেশি পোনা ছাড়িনি।
এবার ফলটা অনেক ভালো হলো। মাছ মরার হার নেমে এলো অনেকটা, আর বিক্রির সময় হাতে কিছু লাভও থাকল।
এখন পেছন ফিরে দেখলে নিজেরই হাসি পায়। সেই প্রথমবারের আমি যেন একটা শিশু, হাতে স্টিয়ারিং নিয়ে গাড়ি চালাতে বসে গিয়েছিল, কিন্তু ব্রেক কোথায় সেটাই জানত না।
আজকাল আমি ঠিক দশ-পনেরো মিনিট পরপর মুঠোফোনে বিদ্যুতের খোঁজ নিই, লাইন আছে কিনা দেখি।
বাড়ির লোকজন রসিকতা করে বলে, স্ত্রীর চেয়ে বেশি নজর রাখি ট্যাংকের ওপর। কথাটা পুরো মিথ্যা না, স্বীকার করতেই হবে।
রোজকার খাটনি — কোনটায় কাজ বেশি
বায়োফ্লক আর পুকুর চাষের মধ্যে একটা বড় পার্থক্য হলো রোজকার খাটনির পরিমাণ। বায়োফ্লকে আপনাকে প্রতিদিন সময় দিতে হবে, পানির রং দেখা, এয়ার পাম্প ঠিকমতো চলছে কিনা সেটা যাচাই করা, নির্দিষ্ট সময়ে চিটাগুড় আর খাবার দেওয়া।
এটা একটা ছোট বাচ্চাকে দেখাশোনা করার মতো, একদিন চোখ সরালেই বিপদ হতে পারে।
পুকুরে এই চাপ অনেক কম। সকালে একবার খাবার দিয়ে, সপ্তাহে কয়েকদিন পুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে দেখলেই চলে।
যাদের চাকরি আছে, বা সারাদিন বাইরে কাজে থাকতে হয়, তাদের জন্য পুকুর চাষ অনেকটা সহজ পথ।
কিন্তু যারা বাড়িতে থাকেন, বা নিজের সময়ের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন, তাদের জন্য বায়োফ্লকের এই বাড়তি খাটনিটা বড় কোনো বাধা না।
একবার ঈদের দিন সকালে সবাই নতুন জামা পরে আত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে যাচ্ছে, আর আমি তখনও ট্যাংকের পাশে দাঁড়িয়ে পানির রং দেখছিলাম।
মামার পুকুরের মাছ সেদিন কারো নজরদারির অপেক্ষায় ছিল না, তারা ঠিক নিজের নিয়মে বড় হচ্ছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, বায়োফ্লক একটা সম্পর্কের মতো, সময় না দিলে চলে না।
খরচ আর লাভের সত্যিকারের হিসাব
এবার আসি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে, কোনটায় লাভ বেশি? সত্যি বলতে, এর একটাই উত্তর নেই, কারণ দুটো পদ্ধতির খরচের ধরনটাই সম্পূর্ণ আলাদা।
বায়োফ্লকে শুরুতে খরচ একটু বেশি পড়ে। আমার প্রথম ট্যাংক, এয়ার পাম্প, পাইপ আর অন্যান্য জিনিসপত্র মিলিয়ে প্রায় বিশ হাজার টাকার মতো লেগেছিল।
তার সাথে প্রতি মাসে বিদ্যুৎ বিল বাড়তি আসে, আর চিটাগুড়, পানি পরীক্ষার সরঞ্জাম, এসবের পেছনেও টাকা যায়।
অনেকের কাছে বিশ হাজার টাকা শুরুতেই জোগাড় করা সহজ কথা না, এটা আমি জানি, কারণ আমি নিজেও কিছুটা ধার করে শুরু করেছিলাম।
পুকুরে শুরুর খরচ তুলনায় কম, যদি আগে থেকেই পুকুর থাকে। পোনা আর সামান্য খাবার দিয়েই শুরু করা যায়, কয়েক হাজার টাকার মধ্যেই কাজ চলে যায়।
কিন্তু যদি পুকুর না থেকে নতুন করে খোঁড়াতে হয়, তাহলে সেই খরচ অনেক বেড়ে যায়, কখনো কখনো বায়োফ্লকের চেয়েও বেশি।
লাভের হিসাবে আসা যাক। বায়োফ্লকে মাছ বড় হয় তুলনামূলক কম সময়ে, আর একই জায়গায় বেশি মাছ থাকে বলে মোট ফলনও বেশি হয়।
আমার দ্বিতীয় চক্রে যে ট্যাংক থেকে মাছ বিক্রি করেছিলাম, খরচ বাদ দিয়ে হাতে যা থেকেছিল, সেটা পুকুরের সমান জায়গায় যে মাছ পেতাম তার চেয়ে বেশিই ছিল।
তবে এই হিসাবে বিদ্যুৎ বিল আর যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ধরা আছে, সেগুলো বাদ দিলে লাভের অঙ্কটা একটু কমে যায়, এটা স্বীকার করতেই হবে।
পুকুরে লাভের অঙ্ক আসে ধীরে, কিন্তু ঝুঁকিও তুলনায় কম। বিদ্যুৎ গেলে মাছ মরবে না, যন্ত্র খারাপ হওয়ার দুশ্চিন্তা নেই।
অনেকটা এমন, যেন আপনি ব্যাংকে টাকা রাখলেন কম সুদে কিন্তু নিশ্চিন্তে, আর বায়োফ্লক হলো এমন একটা পথ যেখানে লাভ বেশি হতে পারে, কিন্তু একটু অসাবধান হলেই সবটাই হারিয়ে যেতে পারে।
বছরে কয়েক চক্র চালানো গেলে বায়োফ্লকে মোট আয়ের অঙ্কটা পুকুরের তুলনায় বেড়ে যায়, কিন্তু সেই সাথে পরিশ্রমও বেড়ে যায় কয়েকগুণ।
এটা মনে রাখা জরুরি, কারণ অনেকে শুধু আয়ের সংখ্যাটা দেখে আকৃষ্ট হন, পরিশ্রমের দিকটা হিসাবে রাখেন না। আমি নিজেও প্রথমে এই ভুলটাই করেছিলাম।
বাজারে বিক্রির সময়টাও মাথায় রাখা জরুরি। বায়োফ্লকের মাছ একসাথে অনেক পরিমাণে তোলা যায়, তাই পাইকারের সাথে দরদাম করার একটা সুযোগ থাকে।
পুকুরে মাছ একটু একটু করে তোলা হয় বলে দাম নিয়ে দরদাম করার সুযোগ কম থাকে, বিক্রেতার কথাই মেনে নিতে হয় বেশিরভাগ সময়।
মাছ বিক্রি করার অভিজ্ঞতা
মাছ বড় করা একটা কাজ, বিক্রি করাটা আরেকটা আলাদা লড়াই। বায়োফ্লকের মাছ যখন প্রথমবার বিক্রির জন্য তুললাম, পাইকার এসে দরদাম করতে শুরু করল, আর আমি দামটা ঠিক কত হওয়া উচিত সেটাই জানতাম না।
আশেপাশের বাজারের দামের সাথে তুলনা না করেই প্রথম দরে রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। পরে জানতে পারলাম একটু বেশি দামে বিক্রি করা যেত। এটাও একটা ভুল ছিল, ছোট হলেও মনে রাখার মতো।
পুকুরের মাছ বিক্রি করতে গিয়ে দেখেছি, স্থানীয় বাজারে নিয়মিত যাওয়া-আসার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়, ক্রেতারা চেনে, দরদাম একটু সহজ হয়।
বায়োফ্লকে একসাথে বড় পরিমাণ মাছ ওঠে বলে পাইকারের ওপর নির্ভর করতে হয় বেশি, আর পাইকার দাম একটু কমিয়েই কথা বলে।
তাই বিক্রির আগে আশেপাশের বাজারের দাম একটু খোঁজ নিয়ে নেওয়াটা জরুরি, এটা আমি নিজের ভুল থেকেই শিখেছি।
কোনটা আপনার জন্য ঠিক
এখন আপনি যদি ভাবছেন, তাহলে আমি কোনটায় যাব, এর উত্তর নির্ভর করে আপনার পরিস্থিতির ওপর।
যদি আপনার হাতে জমি বা পুকুর আগে থেকেই থাকে, আর আপনি এমন কিছু চান যেখানে রোজ রোজ যন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না, তাহলে পুকুরেই থাকা ভালো।
ধীরে হলেও লাভ আসবে, আর রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন।
কিন্তু যদি আপনার জমি না থাকে, ছাদে বা বাড়ির আঙিনায় একটু খালি জায়গা থাকে, আর আপনি কিছুটা সময় দিতে রাজি থাকেন, পানি মাপতে, যন্ত্রের দিকে নজর রাখতে, বিদ্যুৎ গেলে কী করবেন তার একটা পরিকল্পনা রাখতে, তাহলে বায়োফ্লক আপনাকে কম জায়গায় বেশি ফল দিতে পারে।
শুধু মনে রাখবেন, প্রথমবারেই বড় বিনিয়োগ করে ফেলবেন না। আমার মতো ভুল করার আগে ছোট থেকে শুরু করুন, একটা ছোট ট্যাংকে শিখুন, তারপর বাড়ান।
আবার অনেকে দুটো একসাথেও করেন, পুকুর আছে, পাশে একটা ছোট বায়োফ্লক ট্যাংক বসিয়ে দুটোর সুবিধাই নেন।
এতে একদিকে নিশ্চিন্তে চলা পুকুর থাকে, অন্যদিকে একটু বাড়তি আয়ের সুযোগও থাকে। এটাও খারাপ পথ না, বরং অনেকের জন্য এটাই সবচেয়ে নিরাপদ রাস্তা।
আরেকটা কথা বলে রাখি। শুরু করার আগে বাড়ির মানুষদের সাথে কথা বলে নেওয়াটা জরুরি। আমার প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ার পরেও বাড়ির লোকজন পাশে ছিল, এটাই আমাকে আবার দাঁড়াতে সাহায্য করেছিল।
যেকোনো পদ্ধতিতেই যান, একা একা সব ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে যাবেন না, পরিবারকে সাথে রাখুন, আর দরকার হলে অভিজ্ঞ কারো কাছ থেকে পরামর্শ নিন।
আজ যখন এই লেখা লিখছি, ট্যাংকের এয়ার পাম্পের শব্দ কানে আসছে, আর পাশের ব্যাটারি ব্যাকআপটাও তার জায়গায় বসে আছে, যেন বলছে, এবার আর ভয় নেই।
সেই রাতে যখন অর্ধেক মাছ মরে গিয়েছিল, তখন মনে হয়েছিল সব শেষ। কিন্তু আজ বুঝি, সেই ব্যর্থতাটাই আমাকে শিখিয়েছে যা কোনো বই বা ভিডিও শেখাতে পারেনি।
আপনি যদি শুরু করার কথা ভাবছেন, ভয় পাবেন না। ভুল হবে, প্রথমবার হয়তো কষ্টও পাবেন। কিন্তু থেমে গেলে কিছুই শেখা হবে না। ছোট থেকে শুরু করুন, সাবধানে এগোন, নিজের ভুল থেকে শিখুন, বাকিটা সময়ই শিখিয়ে দেবে।
আপনার যদি মাছ চাষের কোনো অভিজ্ঞতা থাকে, ভালো হোক বা খারাপ, নিচে লিখে যেতে পারেন। কে জানে, আপনার একটা ভুলের গল্প হয়তো আরেকজনকে বাঁচিয়ে দেবে, যেমন আমার গল্পটা আজ আপনাকে একটু পথ দেখাল।