বায়োফ্লক কী? ফ্লক কিভাবে কাজ করে?

ভোর পাঁচটা। বাড়ির সবাই ঘুমাচ্ছে। আমি একা ছাদে, ট্যাংকের পাশে বসে আছি। আর ট্যাংকের পানিতে ভেসে থাকা আটটা পুঁটি মাছের দিকে তাকিয়ে আছি। কোনোটা উল্টো হয়ে ভাসছে, কোনোটা কাৎ হয়ে। বুকের ভেতরটা হু হু করছে। চোখে পানি আসছে কি না বলতে পারব না, তবে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। ভাবছিলাম, প্রায় পনেরো হাজার টাকা আর তিন মাসের পরিশ্রম জলে গেল।

তার চেয়েও বড় কথা, স্বপ্নটা গেল। চাকরিটা খুব একটা সুবিধার না, তাই ভেবেছিলাম কিছু একটা নিজের করব। বায়োফ্লক নিয়ে ইউটিউবে কত ভিডিও দেখেছি।

মনে হয়েছিল, আরে এটা তো সহজ! কদিন গুড় আর চুন দিলেই তো ফ্লক তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন ভোররাতে আমার মনে হচ্ছিল, আমি আসলে কিছুই বুঝিনি। কিছুই না।

তোমার কি কখনো এমন লেগেছে? কোনো একটা স্বপ্ন নিয়ে এগিয়েছ, আর প্রথম ধাক্কাতেই সব গুড়িয়ে গেছে? যদি থেকে থাকে, তাহলে তুমি আমার এই লেখাটা বুঝবে।

আর যদি তুমি এখন বায়োফ্লক নিয়ে ভাবছ, দ্বিধায় আছ, ভয় পাচ্ছ, তাহলেও এই লেখা তোমার জন্য। কারণ আমি বিশেষজ্ঞ না, আমি শুধু একজন হোঁচট খাওয়া মানুষ। আর আজকে যেটুকু জেনেছি, সেটা একদম সহজ করে তোমায় বলতে চাই।

বায়োফ্লক কী ?

আমি প্রথম যখন বায়োফ্লকের নাম শুনি, কেউ একজন বলেছিল, “মাছ চাষ করবেন, অথচ পানি বদলাতে হবে না।” ব্যাপারটা শুনে অবাক হয়েছিলাম। কারণ ছোটবেলায় দেখেছি, দাদা পুকুরে মাছ চাষ করলে মাঝেমধ্যে পানি বদলাতে হয়। তাহলে এটা কেমন জিনিস?

পরে জেনেছি, ব্যাপারটা আসলে খুব সোজা। একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করো। তুমি একটা ছোট পুকুর কাটলে। তাতে মাছ ছাড়লে। মাছ খাবে, আর মল ফেলবে। সেই মল থেকে একধরনের বিষ তৈরি হয়, যেটা পানিকে খারাপ করে দেয়। স্বাভাবিক নিয়মে তখন তোমাকে পানি বদলাতে হয়, নইলে মাছ মরে।

কিন্তু বায়োফ্লকে তুমি পানির ভেতরেই একটা ছোট্ট সাফাই কারখানা বানাবে। এই কারখানার শ্রমিক হলো কিছু চোখে না-দেখা জীবাণু। এরা কী করে জানো? মাছের মল আর বাড়তি খাবার খেয়ে ফেলে, আর পানি পরিষ্কার রাখে। শুধু তাই না, এই জীবাণুগুলো জমাট বেঁধে তৈরি করে ছোট ছোট দানা।

দেখতে অনেকটা ভেজা তিলের গুঁড়োর মতো। এই দানাকেই বলে ফ্লক। আর মাছ এই ফ্লক খেয়ে বাঁচে। ব্যাপারটা অনেকটা এমন— তুমি রান্নাঘরের বাদ পড়া জিনিস দিয়ে যদি আবার রান্নার উপকরণ বানাতে পারো, তাহলে যেমন হয়! এক ঢিলে দুই পাখি। পানি যেমন পরিষ্কার থাকল, তেমন মাছের খাবারের খরচও বাঁচল।

তবে এটা জাদু না। এটা একটা জীবন্ত প্রক্রিয়া। যেমন গাছের চারা লাগালে শুরুর দিকে যত্ন করতে হয়, তেমন ফ্লকও তৈরি করতে হয় ধাপে ধাপে। আর এই ধাপগুলো না বুঝলে বিপদ। আমার প্রথম বিপদটা হয়েছিল এই জায়গাতেই।

আমার প্রথম ভুল — তাড়াহুড়ো

বায়োফ্লক নিয়ে পড়াশোনা করে সবচেয়ে যে কথাটা মাথায় ঢুকেছিল, সেটা হলো গুড় দিতে হবে। গুড় হচ্ছে ওই জীবাণুগুলোর খাবার। আমি ভাবলাম, যত বেশি গুড় দেব, তত তাড়াতাড়ি ফ্লক তৈরি হবে। এই ভাবনা যে সর্বনাশ করে দেবে, সেটা বুঝিনি।

আমার ট্যাংকে তখন সবেমাত্র পানি ভরেছি। ডলোমাইট চুন দিয়েছি পিএইচ ঠিক রাখতে। তারপর একটু দানাদার খাবার আর একমুঠো মাটি দিয়েছি— কারণ এই মাটিতেই সেই উপকারী জীবাণু থাকে। মাছও ছেড়েছি অল্প, ভাবলাম ওরাও একটু সয়ে যাক।

কিন্তু তারপরেই যা করলাম, সেটা একদম ঠিক না। পরপর তিনদিন গুড় দিয়ে গেলাম। ভাবলাম, ফ্লক তাড়াতাড়ি রেডি হবে। কিন্তু উল্টোটা হলো। গুড় বেশি হয়ে পানিতে অন্য রকমের খারাপ জীবাণু বেড়ে গেল।

পানি ঘোলা হয়ে এল, আর তার সাথে এলো একধরনের পচা ডিমের গন্ধ। আমি বুঝতেই পারিনি যে এই গন্ধটা বিপদের সংকেত। মাছগুলো হাঁপাতে শুরু করল। আমি তাড়াতাড়ি মোটরের অক্সিজেন বাড়ালাম, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

পরদিন সকালে সেই দৃশ্য। মাছ ভেসে উঠছে। একটা, দুটো, তারপর দশটা। ছোট জাল দিয়ে তুলছি আর বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করছে। ভাবছি, আমি তো মেরে ফেললাম ওদের। আমার বউ এসে বলল, “কী হয়েছে?” কিছু বলতে পারিনি। শুধু ট্যাংকের দিকে তাকিয়ে আছি।

এই ভুলটা থেকে আমি সবচেয়ে বড় যে শিক্ষাটা পাই, সেটা হলো— বায়োফ্লকে তাড়াহুড়ো করা যায় না। ফ্লক তৈরি হতে সময় লাগে। সাত দিন, কখনো দশ দিন, কখনো আরও বেশি। গুড় দিতে হবে, তবে হিসাব করে।

বেশি দিলে পানি খারাপ হবে, কম দিলে ফ্লক হবে না। এটা অনেকটা রান্নার মতোই— লবণ বেশি হলেও খাবার নষ্ট, কম হলেও স্বাদ হয় না।

অভিজ্ঞতা ছাড়া ঠিক পরিমাণটা বোঝা মুশকিল। আর এই অভিজ্ঞতার জন্য প্রথমে ছোট করে শুরু করতে হবে, একেবারে বড় পরিসরে নয়।

দ্বিতীয়বার শুরু — আস্তে পা ফেলে

প্রথমবারের ব্যর্থতার পর প্রায় তিন মাস ট্যাংকের পাশে যাইনি। ছাদে গেলেও ওদিকে তাকাতাম না। ট্যাংকটা পড়ে ছিল, পানি শুকিয়ে গেছে। কিন্তু মনের ভেতরটা শুকায়নি। কিছু একটা ঠিক খচখচ করছিল।

বউ একদিন বলল, “আবার শুরু করো না? ট্যাংকটা এমনি পড়ে রইল। আর এইবার শুরুতেই বেশি না করে অল্প করে করো।” কথাটা খুব সহজ, কিন্তু ওর মুখ থেকে শোনাটা দরকার ছিল। কারণ একজন তো বলুক, “ভুল হয়েছেই, আবার হয়।”

নতুন করে শুরু করলাম। কিন্তু এবার আর ইউটিউবের সব ভিডিও দেখব না ঠিক করলাম। একজনের সঙ্গেই যোগাযোগ করলাম, যে নিজে হাতে করছে। ওই ভাই বললেন, “শুরুতেই বেশি মাছ দিও না। ফ্লক তৈরি হতে দাও। আর প্রতিদিন পানি দেখবে— রঙ কেমন, গন্ধ আসছে কি না। আর গুড় দেওয়া শুরু করবে অল্প করে।”

এই কথাটাই আমার মূলমন্ত্র হয়ে গেল। আমি হাজার লিটারের একটা ট্যাংকে মাত্র তিনশোটা দেশি মাগুর মাছ ছাড়লাম। এই মাছ বেছে নেওয়ার কারণ, এটা খুব শক্ত মাছ।

সহজে মরে না। নতুন চাষিদের জন্য এটা খুব ভালো। তারপর প্রতিদিন শুধু পানি দেখছি। সকালে উঠে এক গ্লাস চা নিয়ে ছাদে যাই, আর ট্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকি।

কোনোদিন পানি একটু ঘোলা লাগে, কোনোদিন স্বচ্ছ। একদিন দেখি পানিতে ছোট ছোট দানা ভাসছে— চায়ের রঙের মতো। বুঝলাম, ফ্লক তৈরি হয়েছে। মনটা যেন হালকা হয়ে গেল।

যেদিন পানির রঙ লাল হয়ে গেল — আরেকটা ধাক্কা, কিন্তু শেষ রক্ষা

তোমাদের আরেকটা ঘটনা বলি। দ্বিতীয়বার যখন মাছ মোটামুটি বড় হচ্ছে, প্রায় দেড় মাস পার হয়েছে, একদিন দুপুরে ছাদে গিয়ে দেখি ট্যাংকের পানি একদম লালচে।

প্রথমবারের ধাক্কাটা তাজা ছিল, তাই বুকটা ধক করে উঠল। ভাবলাম, এই বুঝি আবার গেল সব! তাড়াতাড়ি সেই চাষি ভাইকে ফোন করলাম। বললাম, “পানি লাল, এখন কী করব?”

উনি বললেন, “ভয় নেই। ফ্লক যখন বেশি ঘন হয়ে যায়, তখন অনেক সময় পানির রঙ বাদামি বা লালচে হয়ে যায়। এটা খুব ভয়ের না। তুই এখন অর্ধেক পানি বদলে দে, আর গুড় দেওয়া বন্ধ রাখ দু-তিন দিন। দেখবি ঠিক হয়ে যাবে।”

আমি বললাম, “কিন্তু সবাই তো বলে বায়োফ্লকে পানি বদলাতে হয় না?”

উনি হেসে বললেন, “হয় না মানে কি? জরুরি অবস্থায় না করলে মাছ মরে যাবে। কোনো নিয়মই চোখ বন্ধ করে মানতে হয় না।”

কথাটা আমার মাথায় গেঁথে গেল। আমি অর্ধেক পানি বদলে দিলাম, গুড় বন্ধ রাখলাম। তিনদিনের মধ্যে পানি আবার স্বাভাবিক দুধ-চায়ের মতো হয়ে এল। মাছেরাও আগের মতো খেতে এল। এই ঘটনা আমাকে শেখাল যে, বায়োফ্লক কোনো অটোপাইলট সিস্টেম না।

এটা প্রতিদিন দেখতে হয়, বুঝতে হয়। নিজের ট্যাংকের মর্জিটা বুঝতে হয়। কারণ তোমার ট্যাংকের পরিবেশটা একমাত্র তোমারই। কারোর সঙ্গে পুরোপুরি মিলবে না।

মাছ তোলার দিন

প্রথমবারের সফল মাছ তোলার দিনটার কথা তোমাদের না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থাকে। মাগুর মাছগুলো প্রায় সাড়ে তিন মাস পর তোলার উপযুক্ত হলো।

সেদিন সকালে ছাদে গেলাম, আর ট্যাংকের দিকে তাকিয়ে আছি। হাত দিয়ে মাছ ধরতে গেলে লাফাচ্ছে, ছিটকে পড়ছে। কি যে আনন্দ! বউকে ডাকলাম, বাচ্চাটাকে ডাকলাম। ছোট ছেলে অবাক হয়ে দেখছিল মাছগুলোর লাফানি।

পাইকার এসে মাছ নিয়ে গেল। মোট ত্রিশ হাজার টাকার মাছ বিক্রি হলো। খরচ বাদ দিয়ে লাভ বলতে প্রায় বারো হাজার টাকা। টাকাটা খুব বড় না, কিন্তু সেদিন আমার কাছে মনে হয়েছিল লাখ টাকার চেয়েও বেশি।

কারণ এই টাকা আমি কোনো চাকরি থেকে পাইনি, নিজের হাতে ফলিয়েছি। যে স্বপ্ন একদিন ভোররাতে মাছ মরতে দেখে ভেঙে চুরমার হয়েছিল, সেই স্বপ্নই আবার নতুন করে বাঁচল। এই অনুভূতি ভাষায় বোঝানো কঠিন।

তুমি যদি শুরু করতে চাও, আমার এইটুকুই বলার— খুব বড় করে শুরু কোরো না। হাজার লিটারের একটা ট্যাংক আনো। তাতে শক্ত মাছ চাষ করো, যেমন দেশি মাগুর বা সিং।

শুরুতে লাভের কথা চিন্তা কোরো না, বরং শেখাটাকে লাভ হিসেবে ধরো। ফ্লক বানাতে শেখো, পানির ভাষা বুঝতে শেখো। আর হ্যাঁ, একটা ছোট ডায়েরি রেখো। কবে কতটুকু গুড় দিলে, পানি কেমন দেখাচ্ছে, কোনো গন্ধ পাচ্ছ কি না— এই ছোট ছোট লেখাই তোমাকে একদিন বড় মাপের চাষি বানাবে।

আজ যখন ছাদে সন্ধ্যেবেলা চেয়ার নিয়ে বসি, আর মাছগুলো খাবারের গুলি খেতে টপটপ করে ওঠে, তখন যে শান্তিটা লাগে, সেটা আর কোথাও পাই না।

যেদিন কোনো লাভ থাকে না, শুধু পানি দেখি আর মাছ দেখি, সেদিনও শান্তি থাকে। কারণ এই চাষটা এখন আর শুধু টাকার জন্য না, এটা একটা সম্পর্ক। ট্যাংকের সাথে, মাছের সাথে, আর নিজের সাথে একটা সম্পর্ক।

তোমার ভেতরেও যদি সেই ইচ্ছেটা থেকে থাকে, একদিন চুপিচুপি শুরু করে দিও। মাছ মরবে, পানি ঘোলা হবে, টাকা বসে যাবে। কিন্তু তুমি বসে যেও না। যে মানুষটা নিজের ভুল থেকে শেখে, সে কখনো পুরোপুরি হারে না।

কেমন লাগল আমার এই গল্পটা, জানিও কিন্তু। আর তোমারও যদি কোনো শুরুর গল্প থাকে, বা কোনো প্রশ্ন থাকে, নিচে জানিও। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই তো একে অন্যের পথের আলো হয়ে ওঠে।

Leave a Comment