বাবা ছাদে উঠে দাঁড়িয়ে আছেন, হাতে একটা ফিতা, চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা। আমি তখন ট্যাংক বসানোর জায়গাটা মাপছিলাম। বাবা বললেন, “ছাদ ফেটে গেলে কী হবে, ভেবেছিস?” আমি কিছু বলার আগেই নিচ থেকে পাশের বাড়ির চাচা গলা তুলে ডাক দিলেন, “ভাই, ছাদে কী বসাইতেছেন, সুইমিং পুল নাকি?” হাসব না কাঁদব, বুঝতে পারছিলাম না সেদিন।
এই প্রশ্নটা আমাকে অনেকেই করেন, ছাদে কি আসলেই বায়োফ্লক করা যায়, নাকি এটা শুধু ইউটিউবের ভিডিওতেই সম্ভব? উত্তরটা আমি দিতে পারি, কারণ আমি নিজেই ছাদে করেছি, এখনও করছি। হ্যাঁ, করা যায়। কিন্তু কিছু জিনিস না জেনে নামলে সমস্যায় পড়বেন, যেমন আমি পড়েছিলাম।
আপনি যদি ছাদে একটা ট্যাংক বসানোর কথা ভাবছেন, এই লেখাটা পড়ে যান। যা শিখেছি, ভালো-খারাপ সবটাই বলব।
বাবার সেই দুশ্চিন্তাটা সেদিন একটুও কমাতে পারিনি, বরং পরের কয়েকদিন আমিও একটু চিন্তায় ছিলাম। শেষে পাড়ার একজন রাজমিস্ত্রি কাকাকে ডেকে আনলাম, যিনি আগে অনেক বাড়ি বানিয়েছেন। তিনি ছাদে উঠে দেখলেন, কোথায় বিম গেছে সেটা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন, আর বললেন, “এই বাড়িটা তো দোতলা ওঠানোর কথা মাথায় রেখেই বানানো, তাই এক হাজার লিটারের ট্যাংক কোনো সমস্যাই করবে না, খালি জায়গাটা ঠিক বেছে নিতে হবে।” এই একটা কথাতেই বাবার মুখের ভাঁজগুলো হালকা হয়ে গিয়েছিল। সেদিন বুঝেছিলাম, ভয়টা আসলে অজানা থেকেই আসে, একটু জেনে নিলেই অর্ধেক দুশ্চিন্তা কমে যায়।
ছাদ কি এত ওজন সইতে পারবে
প্রথম প্রশ্নটাই সবার মনে আসে, পানি ভরা একটা ট্যাংক ছাদ সামলাতে পারবে তো? এক হাজার লিটার পানির ওজনই প্রায় এক হাজার কেজি, তার ওপর ট্যাংক আর মাছ যুক্ত করলে আরও বাড়ে। একসাথে দশ-বারোজন মানুষ এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকলে ছাদ যেমন চাপ অনুভব করে, পানির ভারও ঠিক তেমনই।
ঢালাই করা পাকা ছাদ (যেটাকে আমরা আরসিসি ছাদ বলি) সাধারণত এই চাপ নিতে পারে, কিন্তু সেটাও নির্ভর করে ছাদের নিচে কোথায় বিম বা পিলার আছে তার ওপর। আমার নিজের ভুলটা এখানেই হয়েছিল।
প্রথমবার আমি ট্যাংকটা ছাদের একদম কোণে, প্যারাপেটের কাছে বসিয়ে দিয়েছিলাম, কারণ ওখানে রোদ কম পড়বে ভেবেছিলাম।
পরে রাজমিস্ত্রি কাকা এসে দেখে বললেন, ওই অংশটা ছাদের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা, ভেতরের দিকে যেখানে পিলারের লাইন আছে সেখানে বসাতে হবে। শুনে আমার মাথা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল, কারণ ব্যাপারটা মাথায়ই আসেনি।
বড় ট্যাংক বসানোর আগে একবার মিস্ত্রি বা প্রকৌশলীর কাছে জিজ্ঞেস করে নেওয়াটা ভালো। আর একটা বড় ট্যাংকের বদলে দুই-তিনটা ছোট ট্যাংক ছাদের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে বসালে চাপটাও সমানভাবে ভাগ হয়ে যায়, ভাত-ডালের বস্তা যেমন এক কোণে না রেখে ঘরের মাঝে মাঝে ছড়িয়ে রাখলে মেঝের ওপর চাপ কম পড়ে, একই নিয়ম এখানেও কাজ করে।
বাড়িটা কত পুরনো, সেটাও একটা বিষয়। নতুন বাড়ির ছাদ সাধারণত নকশা অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট ভার বহনের ক্ষমতা নিয়েই তৈরি হয়, কিন্তু অনেক পুরনো বাড়ির ছাদে বছরের পর বছর রোদ-বৃষ্টিতে চিড় ধরে যায়, ভেতরের রড দুর্বল হয়ে পড়ে। তেমন বাড়িতে নতুন করে ভারী কিছু বসানোর আগে দুবার ভাবা উচিত। ফ্ল্যাটে থাকলে আবার অন্য মাথাব্যথা, একা সিদ্ধান্ত নিলে চলবে না, ভবনের অন্য মালিকদের বা কমিটির অনুমতি নিতে হয়, কারণ ছাদটা সবার সম্পত্তি। আমার এক পরিচিত ফ্ল্যাটে থেকেও বায়োফ্লক করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কমিটি রাজি হয়নি, শেষে বারান্দায় ছোট একটা ট্যাংকেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছিল তাকে। তাতেও যে কিছু হয় না, তা না, ছোট পরিসরেই অনেকটা শেখা যায়।
পানি চুঁইয়ে নিচে নেমে গেলে কী হবে
এই ভয়টা আমার মায়ের সবচেয়ে বেশি ছিল, নিচের ঘরের ছাদ দিয়ে পানি পড়বে না তো? আর সত্যি বলতে, এই ভয়টা একদমই অমূলক না।
ছাদের ঢালাইয়ে যদি আগে থেকেই কোনো ফাটল থাকে, তাহলে ভারী পানির ট্যাংক বসানোর পর সেই ফাটল দিয়ে পানি চুঁইয়ে নিচে নামার সম্ভাবনা থাকে। ব্যাপারটা মাটির কলসির মতো, কলসিতে একটা সরু ফাটল থাকলেও পানি ধীরে ধীরে গড়িয়ে পড়ে, চোখে বোঝাই যায় না কখন শুরু হয়েছে। আমার বেলায় ঠিক এটাই হয়েছিল।
প্রথমবার ট্যাংক বসানোর আগে ছাদটা ঠিকমতো পরীক্ষাই করিনি। ফাটল চেনার একটা সহজ উপায় আছে, ছাদের কোথাও যদি সাদা সাদা পাউডারের মতো দাগ জমে থাকে, বা রং খসে গিয়ে নিচের সুরকি বেরিয়ে এসেছে, এগুলোই লুকানো ফাটলের চিহ্ন। আমি এসব কিছুই জানতাম না, খালি চোখে ছাদটা মোটামুটি ভালোই লাগছিল, তাই আর কিছু না দেখেই ট্যাংক বসিয়ে দিয়েছিলাম। কয়েক সপ্তাহ পর নিচতলায় থাকা প্রতিবেশী চাচী এসে বললেন, তার ঘরের ছাদে একটা ভেজা দাগ পড়েছে, ক্রমশ বড় হচ্ছে। লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে গিয়েছিল সেদিন। ট্যাংক সরিয়ে দেখি, ছাদের একটা পুরনো সরু ফাটল দিয়ে পানি চুঁইয়ে চুঁইয়ে নিচে নামছিল।
তারপর থেকে আমি একটা নিয়ম মেনে চলি। ট্যাংক বসানোর আগে ছাদ ভালো করে দেখে নিই, কোথাও ফাটল আছে কিনা। সহজ একটা পরীক্ষাও করা যায়, সন্দেহজনক জায়গায় কিছুদিন একটু পানি ফেলে রেখে দেখা, নিচের ঘরের ছাদে কোথাও দাগ পড়ে কিনা। ফাটল থাকলে আগে সেটা মেরামত করি, তারপর ট্যাংকের নিচে একটা পুরু পলিথিন বা ত্রিপলের শিট বিছিয়ে দিই, যাতে কোনোভাবে পানি গড়ালেও সরাসরি ছাদে না পড়ে।
ছাদের ফাটল মেরামত আর ওয়াটারপ্রুফিং করাতে আমার মোটামুটি দুই হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল, সাথে কয়েকদিনের ভোগান্তিও। তখন মনে হয়েছিল টাকাটা বাড়তি খরচ, কিন্তু পরে বুঝেছি এটা না করলে আরও বড় ক্ষতি হতে পারত, নিচের ঘরের রং, কাঠের আসবাব, সবকিছুই পানিতে নষ্ট হয়ে যেতে পারত। চাচীকে পরে মিষ্টি দিয়ে মাফও চেয়ে নিয়েছিলাম, সেই গল্পটা এখনও বাড়িতে হাসির খোরাক হয়ে আছে।
রোদ-বৃষ্টির খেলায় মাছ কি টিকবে
ছাদ মানেই খোলা আকাশ, আর খোলা আকাশ মানেই রোদ আর বৃষ্টি দুটোরই সরাসরি মুখোমুখি হতে হবে। দুপুরের কড়া রোদে পানির তাপমাত্রা অনেকটাই বেড়ে যায়, আর মাছ এই বাড়তি গরম সহ্য করতে পারে না, অসুস্থ হয়ে পড়ে, কখনো মরেও যায়। প্রথম গরমকালে আমার একটা ট্যাংকে এই সমস্যাই হয়েছিল, দুপুরে পানি এত গরম হয়ে গিয়েছিল যে মাছ ভেসে ভেসে শ্বাস নিচ্ছিল।
থার্মোমিটার কেনার আগে আমি হাত ডুবিয়েই বুঝতাম পানি কতটা গরম, একদিন দুপুরে হাত দিয়ে দেখি পানিটা প্রায় কুসুম গরম চায়ের মতো লাগছে। তখনই বুঝেছিলাম, এভাবে চলতে দেওয়া যাবে না। এখন একটা ছোট থার্মোমিটার রাখি, আর দুপুরের দিকে পানির তাপমাত্রা একবার দেখে নিই, বেশি বেড়ে গেলে বুঝি ছায়ার ব্যবস্থা আরও বাড়াতে হবে।
এখন আমি ট্যাংকের ওপর একটা ছায়ার জাল (শেড নেট) টাঙিয়ে রাখি, যাতে সরাসরি রোদ না লাগে কিন্তু বাতাস চলাচল করতে পারে। পুরো ছাদ ঢেকে দেওয়াটাও ঠিক না, কারণ পানিতে কিছুটা আলো না পড়লে জীবাণুর কাজটাও ঠিকমতো হয় না, তাই হালকা ছায়াই যথেষ্ট, একদম অন্ধকার করে দেওয়ার দরকার নেই।
শীতকালে সমস্যাটা উলটো দিকে যায়, রাতের ঠান্ডায় পানির তাপমাত্রা অনেক নেমে গেলে মাছ অলস হয়ে পড়ে, খাওয়াও কমিয়ে দেয়। আমার শীতের প্রথম বছরে এটা বুঝতে পারিনি, খাবার আগের মতোই দিয়ে যাচ্ছিলাম, পরে দেখি খাবার পানিতেই পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, মাছ ছুঁচ্ছেই না। এখন শীতে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে দিই, আর সম্ভব হলে ট্যাংকের চারপাশে একটা পলিথিনের ঘের দিয়ে রাখি, যাতে ঠান্ডা বাতাস সরাসরি না লাগে।
বৃষ্টির দিকেও নজর রাখতে হয়, ভারী বৃষ্টি হলে ট্যাংক উপচে পানি বাইরে চলে যেতে পারে, সাথে মাছও বেরিয়ে যেতে পারে। তাই ট্যাংকের দেয়াল একটু উঁচু রাখা, আর বাড়তি পানি বের হওয়ার একটা ছোট নালার ব্যবস্থা রাখা ভালো।
একদিনের কথা মনে পড়ে, হঠাৎ মেঘ ডেকে বৃষ্টি নেমে এলো, আর আমি তখন বাজারে। বাড়ি ফিরে দেখি ছোট ভাইবোনেরা ছাতা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে ট্যাংকের ওপর ত্রিপল টানার চেষ্টা করছে, একজনের ছাতা উলটে গেছে বাতাসে, সবাই হাসতে হাসতে ভিজে গেছে। সেদিন বুঝেছিলাম, ছাদের চাষে পরিবারও কীভাবে জড়িয়ে যায়।
ছাদের জন্য কোন মাছ ভালো
ছাদের গরম আর তাপমাত্রার ওঠানামা সব মাছ সহ্য করতে পারে না। যে মাছগুলো কম অক্সিজেনে আর একটু গরম পানিতেও টিকে থাকতে পারে, সেগুলোই ছাদের জন্য ভালো। যেমন কই, মাগুর, শিং, তেলাপিয়া। এই মাছগুলোর শরীরে এমন একটা ব্যবস্থা আছে যার সাহায্যে তারা সরাসরি বাতাস থেকেও কিছুটা অক্সিজেন নিতে পারে, তাই পানির অক্সিজেন কমে গেলেও এরা সহজে মরে না। রুই, কাতলার মতো মাছ এই অবস্থায় বেশি কষ্ট পায়, ছাদের ছোট ট্যাংকে এসব মাছ না রাখাই ভালো, এরা পুকুরের খোলামেলা পরিবেশেই বেশি ভালো থাকে।
আমি শুরুতে কই দিয়েই শুরু করেছিলাম, কারণ আশেপাশের অনেকেই বলেছিলেন এই মাছ সহজে মরে না, নতুনদের জন্য নিরাপদ। পরে যখন একটু অভিজ্ঞতা হলো, তেলাপিয়াও যুক্ত করেছি, কারণ এটা দ্রুত বাড়ে আর বাজারেও চাহিদা ভালো। আপনি যদি প্রথমবার শুরু করছেন, আমার পরামর্শ থাকবে কই বা তেলাপিয়া দিয়েই শুরু করুন, ভুল হলেও সহজে সামলে নিতে পারবেন, বড় ক্ষতির ঝুঁকি কম।
কোন মাছ ছাড়বেন সেটাও আশেপাশের কারো কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো, এলাকার আবহাওয়া আর পানির ধরন বুঝে কেউ একটা পরামর্শ দিতে পারলে অনেক সময় বেঁচে যায়, আমার নিজের প্রথম ভুলগুলো এড়ানো যায়।
প্রতিবেশী আর বাড়িওয়ালার চোখ এড়িয়ে যাবেন না
ছাদে কিছু করতে গেলে আপনি একা থাকেন না, আশেপাশের মানুষও জড়িয়ে যায়। যে চাচা সুইমিং পুলের কথা বলে হাসাহাসি করেছিলেন, তিনিই পরে একদিন এসে জিজ্ঞেস করলেন, মাছ কেমন বড় হচ্ছে, পানিতে কি দুর্গন্ধ হয় না। দুর্গন্ধের ভয়টা অনেকের মধ্যেই থাকে, কারণ পুকুরের কচা পানির গন্ধের কথা মাথায় আসে। কিন্তু বায়োফ্লক ঠিকমতো চালালে পানিতে তেমন গন্ধ হয় না, এটা বুঝিয়ে বলার পর চাচার মুখে স্বস্তি দেখেছিলাম।
এয়ার পাম্পের শব্দও একটা বিষয়, রাতের নিস্তব্ধতায় টানা গুনগুন আওয়াজ কারো কারো বিরক্তির কারণ হতে পারে। তাই পাম্পটা যতটা সম্ভব প্রতিবেশীর জানালা বা বারান্দার বিপরীত দিকে রাখা ভালো। বাড়িওয়ালা বা ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে অন্য মালিকদের আগে থেকে জানিয়ে রাখাটাও ভদ্রতা, পরে ঝামেলা হওয়ার চেয়ে আগে কথা বলে নেওয়া অনেক সহজ।
আরেকটা প্রশ্ন প্রায় সবাই করেন, ছাদে এত পানি জমে থাকলে মশা হবে না? এই ভয়টা স্বাভাবিক, কারণ আমরা ছোট থেকেই শুনে এসেছি জমা পানিতে মশা বংশবিস্তার করে। কিন্তু বায়োফ্লকের ট্যাংকে এয়ার পাম্প চলার কারণে পানি সব সময় নাড়াচাড়া হয়, আর মশার লার্ভা শান্ত পানি পছন্দ করে, নাড়াচাড়া হওয়া পানিতে তারা টিকতে পারে না। এই ব্যাপারটা বুঝিয়ে বললে বেশিরভাগ মানুষই আশ্বস্ত হন।
আমি একটা ছোট কাজ করেছিলাম, প্রথমবার মাছ বিক্রির আগে কয়েকটা মাছ প্রতিবেশীদের বাড়িতে রান্না করে খাওয়ার জন্য দিয়েছিলাম। এতে তাদের মনের সন্দেহটা অনেকটাই কেটে গিয়েছিল, আর এখন তারাই বরং খোঁজ নেন, পরের চক্রের মাছ কবে পাওয়া যাবে।
ছাদে পানি আর বিদ্যুৎ আনবেন কীভাবে
ছাদে চাষ করার একটা বাস্তব ঝামেলার কথা কেউ আগে বলেনি আমাকে, পানি আর বিদ্যুৎ ওপরে তোলার ব্যাপারটা। নিচ থেকে বালতি করে পানি তুলতে গিয়ে প্রথম কয়েকদিনে হাত-পায়ের যা ব্যথা হয়েছিল, তা ভোলার মতো না। পরে একটা ছোট পানির মোটর কিনে পাইপ দিয়ে সরাসরি ছাদে পানি তোলার ব্যবস্থা করেছিলাম, এতে কষ্ট অনেকটাই কমে গেছে।
বিদ্যুতের লাইনও ছাদ পর্যন্ত আনতে হয়, এয়ার পাম্প চালানোর জন্য একটা স্থায়ী সংযোগ লাগে। তারের সংযোগ যেন বৃষ্টির পানির সংস্পর্শে না আসে, এটা মাথায় রাখা জরুরি, কারণ ছাদ মানেই খোলা জায়গা, আর পানি-বিদ্যুৎ একসাথে মিশলে বিপদ অনেক বড়। আমি তারগুলো একটা ছোট ঢাকনাযুক্ত বাক্সে রেখেছি, আর সংযোগের জায়গাটা একটু উঁচুতে রাখি, যাতে পানি জমলেও সমস্যা না হয়।
পানির মোটর আর তার বিদ্যুৎ সংযোগ মিলিয়ে আমার বাড়তি প্রায় তিন হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছিল, যা প্রথম হিসাবের মধ্যেই ছিল না, পরে বুঝেছিলাম এই খরচটাও আসলে শুরুর বাজেটের একটা অংশ, আলাদা করে ভাবলে চলবে না। যারা ছাদে শুরু করবেন ভাবছেন, এই খরচটাও আগে থেকেই মাথায় রেখে দিলে পরে হঠাৎ চাপে পড়তে হবে না।
কতটুকু জায়গা লাগে, ছোট থেকেই শুরু করুন
অনেকে ভাবেন ছাদে বায়োফ্লক করতে অনেক বড় জায়গা লাগে, আসলে তা না। চার ফুট বাই চার ফুট জায়গাতেও একটা ভালো ট্যাংক বসানো যায়। আমার প্রথম ট্যাংকটা ছিল এক হাজার লিটারের, বসাতে খরচ হয়েছিল ছয়-সাত হাজার টাকার মতো, এয়ার পাম্প আর অন্য জিনিসপত্র ধরে। এটা অনেকের কাছে কম মনে হলেও, প্রথমবার শুরু করার জন্য একদমই কম না, আমি নিজেও কিছুটা ধার করেই জোগাড় করেছিলাম।
ছোট থেকে শুরু করার আরেকটা সুবিধা আছে, ভুল করলেও ক্ষতিটা সীমিত থাকে। আমি যদি প্রথমেই বড় তিন-চারটা ট্যাংক বসাতাম, তাহলে ফাটল আর গরমের সমস্যাগুলো আরও বড় আকারে আসত, ক্ষতিও হতো বেশি। একটা ছোট ট্যাংকে হাত পাকিয়ে নিয়ে, ছাদের ব্যাপারগুলো বুঝে নিয়ে, তারপর ধীরে ধীরে বাড়ানোই বুদ্ধিমানের কাজ।
এখন প্রায় দেড় বছর পর ছাদে আমার দুটো ট্যাংক চলছে। দ্বিতীয় ট্যাংকটা বসানোর আগে অনেকবার ছাদে উঠে জায়গা মাপা, পিলারের লাইন খুঁজে বের করা, বাবার সাথে বসে আলোচনা করা, সবটাই করেছিলাম। বাবা এখন আর দুশ্চিন্তা করেন না, বরং বিকেলে চা নিয়ে ছাদে উঠে আসেন, ট্যাংকের পাশে বসে গল্প করেন। সেই প্রথম দিনের ফিতা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাই আজ সবচেয়ে বড় সমর্থক।
আজকাল বিকেলের দিকে যখন ছাদে উঠি, রোদ পড়ে পানিতে একটা মিষ্টি ঝিলিক তৈরি হয়, আর মাছগুলো ঘুরঘুর করে। সেই প্রথম দিনের আতঙ্ক, বাবার দুশ্চিন্তা, চাচার রসিকতা, চাচীর অভিযোগ, সবকিছু এখন একটা গল্পের মতো শোনায়। কিন্তু সেই দিনগুলো না পেলে আজকের এই শান্তিটাও আসত না।
আপনার যদি ছাদ থাকে, আর মন বলে একবার চেষ্টা করি, তাহলে ভয় পাবেন না। ছাদ পরীক্ষা করুন, ছোট থেকে শুরু করুন, প্রতিবেশীদের সাথে কথা বলে রাখুন, বাকিটা ধীরে ধীরে শিখে যাবেন, যেমন আমি শিখেছি। যে মানুষটা একসময় সুইমিং পুল বলে হাসত, সেও একদিন আপনার পাশে দাঁড়িয়ে মাছের গল্প করবে, এটা আমি নিজের চোখে দেখেছি। ভয়টা আসলে প্রথম পা ফেলার আগেই সবচেয়ে বড় থাকে, একবার শুরু করে ফেললে বাকি পথটা নিজে থেকেই একটু একটু করে সহজ হতে শুরু করে।
আপনার ছাদে যদি ইতিমধ্যে কিছু করার অভিজ্ঞতা থাকে, বা করার ইচ্ছা থাকে, নিচে লিখে যেতে পারেন। কে জানে, আপনার ছাদের গল্পটাও একদিন আরেকজনকে সাহস দিতে পারে।