মাটি শুকালেই পাম্প চালু হয় | Automatic Plant Watering System

ঈদের ছুটিতে খালার বাসায় বেড়াতে গেছিলাম। খালার বাসা ঢাকায়। অনেক বড় বিল্ডিং। উপরে ছাদে উঠলাম। দেখি কত কত গাছ! টমেটো, ধনেপাতা, মরিচ, ফুলের গাছ। খালা বললেন এইটা তার ছাদ বাগান।
আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম। তখন খালার ছেলে সিজান ভাই আমাকে ডাকলো। বললো দেখ একটা মজার জিনিস আছে। একটা ছোট পাম্প লাগানো। আর একটা সবুজ বোর্ড। সিজান ভাই বললো এইটা নিজে নিজে গাছে পানি দেয়!
আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না!
এইটা কিভাবে কাজ করে
সিজান ভাই বোঝাতে শুরু করলো। বললো মাটিতে একটা সেন্সর ঢোকানো আছে। সেইটার নাম Soil Moisture Sensor। এইটা মাটি শুকনো না ভেজা সেইটা বুঝতে পারে।
মাটি শুকিয়ে গেলে সেন্সর আর্ডুইনোকে বলে দেয়। আর্ডুইনো তখন পাম্প চালু করে দেয়। পাম্প পানি দেয়। মাটি ভেজা হলে পাম্প বন্ধ হয়ে যায়।
সিজান ভাই বললো খালা প্রতিদিন অফিসে যান। পানি দিতে ভুলে যেতেন। অনেক গাছ মরে গেছিল। তখন সে এই জিনিস বানাইছে। এখন আর ভুল হয় না।
আমার মনে হয় এইটা অনেক বুদ্ধিমান একটা জিনিস!
কি কি লাগছে
খালার ছাদে বসে সিজান ভাই সব দেখালো। আমি মনোযোগ দিয়ে দেখলাম।
Arduino Uno লাগছে। এইটা ওই সবুজ বোর্ড। Soil Moisture Sensor লাগছে। এইটা মাটিতে ঢোকানো থাকে। Water Pump লাগছে। এইটা পানি তোলে। Relay Module লাগছে। এইটা পাম্প অন অফ করে। তার আর ব্রেডবোর্ড লাগছে। আর পাওয়ার দেওয়ার জন্য অ্যাডাপ্টার।
সিজান ভাই বললো সব কিছু মিলিয়ে বেশি খরচ হয়নাই। আমার কাছে মনে হয় টাকা খরচ করে এইটা বানানো অনেক লাভের।
সার্কিট কিভাবে লাগানো
ঈদের দিন বিকেলে সিজান ভাই আমাকে পুরোটা দেখালো। খালা চা নিয়ে আসলেন। আমরা তিনজন ছাদে বসে আছি। নিচে রাস্তায় গাড়ির শব্দ। উপরে রোদ।
Soil Moisture Sensor এর তিনটা পা আছে। একটা পা আর্ডুইনোর 5V তে লাগানো। একটা A0 পিনে। আরেকটা GND তে।
Relay Module এর IN পিন আর্ডুইনোর ডিজিটাল পিনে। তারপর পাম্প Relay দিয়ে কানেক্ট করা।
সিজান ভাই বললো তার লাগানোর সময় রঙ মিলিয়ে লাগাবে। লাল তার মানে পজিটিভ। কালো তার মানে নেগেটিভ। এইটা মনে রাখলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
আর একটা কথা। সব তার ভালোমতো লাগাতে হবে। ঢিলা থাকলে পাম্প হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। সিজান ভাই বললো একবার তার ঢিলা হয়ে গেছিল। দুইদিন পাম্প চলেনাই। কিছু গাছ প্রায় মরতে বসছিল। তারপর থেকে সে প্রতি সপ্তাহে একবার চেক করে।
কোড কিভাবে কাজ করে
সিজান ভাই ল্যাপটপ খুলে কোড দেখালো। আমি মনোযোগ দিয়ে দেখলাম।
কোডে বলা আছে সেন্সর A0 পিন থেকে রিডিং নেবে। রিডিং যদি ৭০০ এর বেশি হয় মানে মাটি শুকনো। তখন পাম্প চালু হবে। ৭০০ এর কম হলে মাটি ভেজা। পাম্প বন্ধ থাকবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম ৭০০ কেন? সিজান ভাই বললো এইটা নিজে ঠিক করতে হয়। আগে শুকনো মাটিতে রিডিং দেখো। তারপর ভেজা মাটিতে রিডিং দেখো। সেই দুই রিডিংয়ের মাঝামাঝি একটা সংখ্যা দিয়ে দাও। এইটাকে Calibration বলে।
Serial Monitor খুললে রিডিং দেখা যায়। সিজান ভাই দেখালো। স্ক্রিনে লেখা আসছে Soil Dry: Pump ON। তারপর পাম্প চালু হলো। পানি পড়তে শুরু করলো।
আমি হাততালি দিলাম! খালা হেসে বললেন আমার ছেলে অনেক মেধাবী!
কোড আপলোড কিভাবে করলো
সিজান ভাই বললো Arduino IDE লাগে। এইটা ফ্রি। ওইখানে কোড লিখতে হয়।
তারপর USB দিয়ে বোর্ড কানেক্ট করতে হয়। Tools থেকে বোর্ড আর Port সিলেক্ট করতে হয়। তারপর Upload চাপতে হয়।
সিজান ভাই বললো Port সিলেক্ট না করলে Upload হয় না। এইটা অনেকে ভুলে যায়।
Calibration কেন দরকার
এইটা আমি প্রথমে বুঝিনাই। সিজান ভাই বোঝালো।
সব গাছ একরকম না। টমেটো গাছে বেশি পানি লাগে। ক্যাকটাসে কম লাগে। তাই প্রতিটা গাছের জন্য আলাদা রিডিং ঠিক করতে হয়।
সিজান ভাই বললো প্রথমে Serial Monitor দিয়ে দেখে নাও মাটি শুকনো অবস্থায় রিডিং কত আসছে। তারপর পানি দিয়ে দেখো ভেজা অবস্থায় কত আসছে। তারপর মাঝামাঝি সংখ্যা কোডে দিয়ে দাও।
এইটা না করলে পাম্প ভুল সময়ে চলবে। বেশি পানি দিলে গাছের শিকড় পচে যায়। এইটা জেনে আমি একটু চিন্তিত হলাম। গাছ মরে যাওয়া ভালো না।
সমস্যা হলে কি করবো
সিজান ভাই বললো কিছু সমস্যা হয়ই।
পাম্প না চললে প্রথমে তার চেক করো। GND ঠিকমতো লাগানো আছে কিনা দেখো। Relay কাজ করছে কিনা দেখো।
সেন্সর ভুল রিডিং দিলে Serial Monitor খুলে দেখো কি আসছে। রোদে সেন্সর রাখলে মাঝে মাঝে সমস্যা হয়। ছায়ায় রাখলে ভালো।
পাওয়ার কম হলেও সিস্টেম ঠিকমতো কাজ করে না। বড় পাম্পে ১২ ভোল্ট দরকার হয়। ছোট পাম্পে ৫ ভোল্টে চলে।
সিজান ভাই বললো একবার সেন্সর নষ্ট হয়ে গেছিল। নতুন কিনে লাগাইছে। দাম বেশি না।
আরো বড় করা যাবে
খালা জিজ্ঞেস করলেন এইটা আরো ভালো করা যায় না? সিজান ভাই বললো অবশ্যই।
WiFi লাগালে মোবাইলে দেখা যাবে মাটি ভেজা না শুকনো। অফিসে বসেও দেখতে পারবেন। তাপমাত্রা মাপার সেন্সরও লাগানো যাবে। সোলার প্যানেল লাগালে কারেন্ট লাগবে না।
খালা বললেন সোলার লাগালে ভালো হয়। গরমে প্রায়ই লোডশেডিং হয়। তখন গাছে পানি পড়ে না।
আমার কাছে মনে হয় পরে এইটা আরো স্মার্ট হবে।
শেষে বলি
ঈদের ছুটি শেষ হলো। বাড়ি ফেরার সময় খালার ছাদ বাগানের কথা মনে পড়লো। কত সুন্দর টমেটো ধরছে। কত সবুজ গাছ। আর সব গাছে ঠিকমতো পানি পড়ছে। কেউ মনে করিয়ে না দিলেও।
বাসে বসে ভাবলাম আমাদের বাড়িতেও কিছু গাছ আছে। আম্মু পানি দিতে ভুলে যান মাঝে মাঝে। একদিন এইটা বানিয়ে দেবো আম্মুকে।
তাই আমার মনে হয় যার বাড়িতে গাছ আছে তার এইটা বানানো উচিত!
