বায়োফ্লকে কোন মাছ সবচেয়ে বেশি লাভ দেয়?

হাটবারে মাছ বিক্রি করতে গিয়েছিলাম গত মাসে। পাশের ডালায় রহিম ভাই শিং মাছ সাজিয়ে বসে আছেন, দাম হাঁকছেন কেজি সাতশো। আর আমি তেলাপিয়া নিয়ে পাশে বসা, দাম কেজি একশো আশি। একই পরিশ্রম, একই ট্যাংক, একই এয়ার পাম্পের গুনগুন শব্দ রাতভর, তবু দামের পার্থক্য এতটা।

সেদিন মনে হয়েছিল, শুধু মাছ চাষ শিখলেই হয় না, কোন মাছ চাষ করবেন সেটা ঠিক করাটাও একটা বড় সিদ্ধান্ত।

হাটে এক মুরুব্বি জিজ্ঞেস করলেন, “কই মিয়া, তেলাপিয়া বেচো কেন? শিং চাষ করো না, দাম ভালো।” আমি হেসে বললাম, “চাচা, শিং বেচলে দাম ভালো পাব ঠিকই, কিন্তু আগে শিং বাঁচাতে পারতে হবে না?” মুরুব্বি একটু চুপ থাকলেন, তারপর বললেন, “তা ঠিক।” এই ছোট্ট কথোপকথনটাই আসলে আজকের পুরো লেখার সারকথা।

আমার নাম নাজমুল। বয়স ছাব্বিশ। গ্রামে থাকি, বাড়ির পেছনে একটু খালি জায়গায় দুটো ট্যাংক নিয়ে বায়োফ্লক করছি প্রায় দুই বছর ধরে।

আগের পোস্টগুলো যারা পড়েছেন, তারা জানেন কোথা থেকে শুরু হয়েছিল এই গল্প — হাতে টাকা কম, অভিজ্ঞতা নেই, আর একবার মাছ মরে গিয়ে পুরো মন ভেঙে গিয়েছিল।

সেই সব পেরিয়ে এখন যেটুকু শিখেছি, এই পোস্টে সেটাই বলব — কোন মাছ চাষ করলে আসলে লাভ বেশি, আর কোনটায় নামলে বিপদে পড়তে পারেন।

তবে আগেই বলে রাখি, আমি কোনো মৎস্য গবেষক না। আমি একটা সাধারণ ছেলে, যে হাতেকলমে কিছু শিখেছে। যা বলব সব নিজের অভিজ্ঞতা থেকে।

কোন মাছ বেছে নেবেন, সেটা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ

বায়োফ্লকের ট্যাংকে সব মাছ একইভাবে বড় হয় না। পুকুরে নেমে দিলেই মাছ বড় হয়, কিন্তু ট্যাংকের ঘন পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা সব মাছের নেই।

কিছু মাছ বেশি ঘনত্বে থাকলে শ্বাস নিতে পারে না, পানির অক্সিজেন কমে গেলেই মরতে শুরু করে। আবার কিছু মাছ আছে যেগুলো শতখানেক ঠাসাঠাসি করে থাকলেও হাসিমুখে খেয়েদেয়ে বড় হয়।

তার ওপর আছে বাজার দরের ব্যাপার। যে মাছ চাষ করা সহজ, তার দাম প্রায়ই কম। আর যে মাছের দাম বেশি, সেটা চাষ করাও কঠিন। এই দুটো জিনিস একসাথে বুঝে মাছ বেছে না নিলে পরিশ্রম করেও লাভের মুখ দেখা কঠিন।

আমি নিজে প্রথমবার মাগুর মাছ দিয়ে শুরু করতে চেয়েছিলাম, কারণ গ্রামের বাজারে দাম ভালো দেখেছিলাম। পরে জানলাম মাগুর একটু বেশি যত্নের মাছ, সব পরিবেশে সহজে মানায় না। শেষে কই দিয়ে শুরু করেছিলাম। যা হয়েছিল সেটা পরে বলছি।

কই মাছ — শুরু করার জন্য সবচেয়ে ভালো

কই মাছের কথা বললে আমার মনে পড়ে প্রথমবার ট্যাংকে পোনা ছাড়ার সেই সন্ধ্যার কথা। আব্বা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মুখে কিছু বলছিলেন না, কিন্তু চোখে একটা প্রশ্ন ছিল, এই ছেলে আসলে কী করছে। পোনাগুলো পানিতে ছেড়ে দেওয়ার পর একটু একটু করে ঘুরতে শুরু করল, সেদিন মনটা হালকা হয়ে গিয়েছিল।

কই মাছ বায়োফ্লকের জন্য ভালো কারণ এই মাছের শরীরে একটা বিশেষ অঙ্গ আছে যার নাম লেবিরিন্থ অঙ্গ, মানে সহজ বাংলায় বললে এই মাছ সরাসরি বাতাস থেকেও অক্সিজেন নিতে পারে।

ফলে পানির অক্সিজেন একটু কমে গেলেও, এমনকি বিদ্যুৎ চলে গিয়ে এয়ার পাম্প বন্ধ হলেও, কই মাছ রুই বা কাতলার মতো চটজলদি মরে না। এই গুণটাই নতুনদের জন্য কইকে নিরাপদ করে তোলে।

বাজারে কইয়ের দাম কেজি তিনশো থেকে পাঁচশো টাকার মধ্যে থাকে সাধারণত, এলাকা আর মৌসুমভেদে কিছুটা ওঠানামা করে।

চাষের চক্র চার থেকে পাঁচ মাসের মতো, তারপর বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়। খাওয়াও সহজ, যে খাবার পাওয়া যায় সেটাই খায়, বেশি পছন্দ-অপছন্দ নেই।

ক্ষতির দিক বলতে গেলে, একটাই কথা, কই মাছে একটু বেশি রোগবালাই হয়। পানির গুণ একটু খারাপ হলে গায়ে ঘা দেখা দেয়। তাই নিয়মিত পানি পরীক্ষা করা জরুরি। আমার দ্বিতীয় চক্রে কইয়ের একটা ব্যাচে এই ঘা লেগেছিল, অর্ধেক মাছ দুর্বল হয়ে গিয়েছিল।

পরে বাজার থেকে একটা ওষুধ এনে পানিতে দিয়ে সামলেছিলাম, কিন্তু ভালো হতে সময় লেগেছিল। সেই চক্রে লাভ বেশি হয়নি, কারণ অসুস্থ মাছ দেরিতে বড় হয়।

তারপরও কই আমার প্রথম পছন্দ নতুনদের জন্য। কারণ ভুল হলে সামলানোর সুযোগ পাওয়া যায়, রুই বা কাতলার মতো একবার চট করে মরে শেষ হয়ে যায় না।

তেলাপিয়া — কম ঝামেলায় বেশি মাছ

তেলাপিয়া মাছটাকে আমি বলি বায়োফ্লকের মজুর মাছ। কারণ এই মাছ কষ্ট সহ্য করে, কম যত্নেও বড় হয়, আর পাঁচ-ছয় মাসের মধ্যে বিক্রির উপযোগী সাইজে চলে আসে।

খাবার খরচও তুলনামূলক কম, কারণ তেলাপিয়া বায়োফ্লকের ভেতরের জীবাণু-দানাও কিছুটা খায়, ফলে বাইরের খাবার একটু কম লাগে।

কিন্তু সমস্যা হলো দাম। তেলাপিয়ার বাজার দর সাধারণত একশো পঞ্চাশ থেকে দুইশো পঞ্চাশ টাকার মধ্যে ঘোরে। হাটবারে গেলে দেখা যায় তেলাপিয়ার স্তূপ, মানে সরবরাহ অনেক বেশি, তাই দাম সেভাবে ওঠে না।

একবার হাটে দেখেছিলাম তিনজন বিক্রেতা একসাথে তেলাপিয়া নিয়ে বসেছেন, একজন দাম কমাচ্ছেন, বাকিরাও কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। সেদিন বুঝেছিলাম, তেলাপিয়ায় প্রতিযোগিতাটা বেশি।

পরিমাণে বেশি মাছ উৎপাদন করলে তেলাপিয়ায় মোট আয় ঠিকঠাক থাকে, কিন্তু একটা ছোট ট্যাংকে তেলাপিয়া চাষ করলে লাভের মুখ দেখা কঠিন।

যারা একটু বেশি বাজেটে বড় পরিসরে শুরু করছেন, তিন-চারটা ট্যাংক একসাথে চালাচ্ছেন, তাদের জন্য তেলাপিয়া একটা নিরাপদ বিকল্প। একটা ট্যাংকে কই, আরেকটায় তেলাপিয়া রাখলে ঝুঁকিও ভাগ হয়, আর একই সময়ে দুই রকম মাছ বিক্রি করা যায়।

আমি এখন এটাই করছি। একটা ট্যাংকে কই, আরেকটায় তেলাপিয়া। কইয়ের দাম বেশি, কিন্তু তেলাপিয়া তাড়াতাড়ি বড় হয়, তাই মোট হিসাবে দুটো মিলিয়ে মোটামুটি চলে যাচ্ছে।

এটাকে বলতে পারেন দুই ফসলের মতো, একটায় দাম বেশি, আরেকটায় ফলন বেশি, দুটো মিলিয়ে সংসার চলে।

শিং আর মাগুর

হাটে রহিম ভাইয়ের শিং মাছ কেজি সাতশো টাকায় বিক্রি হচ্ছিল সেদিন, এটা মিথ্যা না। মাগুরের দামও কাছাকাছি, কখনো কখনো আরও বেশি। এই দুটো মাছ দেখলে মনে হয় এটাই চাষ করলে সবচেয়ে বেশি লাভ।

কিন্তু এই দুটো মাছে নামার আগে কিছু কথা জানা দরকার। শিং আর মাগুর দুটোই খুব সংবেদনশীল মাছ, মানে পানির একটু ওঠানামাতেই এদের শরীরে প্রভাব পড়ে।

পানির অ্যামোনিয়া একটু বেড়ে গেলে এরা খাওয়া বন্ধ করে দেয়, তারপর দুর্বল হয়ে পড়ে। বিদ্যুৎ গিয়ে পাম্প বন্ধ হয়ে গেলে কই বা তেলাপিয়া কিছুটা সময় পার করতে পারে, কিন্তু শিং-মাগুর অনেক দ্রুত সংকটে পড়ে।

আমার এক পরিচিত, ইউসুফ ভাই, গত বছর সরাসরি শিং মাছ দিয়ে শুরু করেছিলেন। বাজারের দাম দেখে উৎসাহী হয়ে একসাথে দুই হাজার পোনা কিনেছিলেন।

দুই মাস পর তার ট্যাংকের পানির রং বদলে গেল, অ্যামোনিয়া বেড়ে গিয়েছিল, পানি পরীক্ষার যন্ত্র ছিল না, তাই বুঝতেই পারেননি কী হচ্ছে। এক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় সব মাছ মরে গেল। হাজার পনেরো টাকার মতো ক্ষতি হয়েছিল, সেটা তার কাছে অনেক বড় ধাক্কা ছিল।

ইউসুফ ভাইয়ের কথা এখানে বললাম কারণ সেটা আমার নিজের গল্পও হতে পারত। শিং বা মাগুর দিয়ে শুরু করাটা মানা করছি না, কিন্তু এই মাছে নামতে হলে পানি পরীক্ষার যন্ত্র থাকতেই হবে, নিয়মিত দেখার অভ্যাস থাকতে হবে, আর বিদ্যুৎ চলে গেলে কী করবেন সেটার একটা পরিকল্পনা আগে থেকে রেডি থাকতে হবে।

অন্তত এক চক্র কই বা তেলাপিয়া চাষ করে হাত পাকিয়ে নিলে তারপর শিং-মাগুরে যাওয়াটা অনেক বেশি নিরাপদ।

পাবদা

পাবদা মাছের নাম শুনলে গ্রামের যেকোনো মানুষের মুখে জল আসে। রান্না যেমন সুস্বাদু, বাজারে দামও তেমন উঁচু, কেজি আটশো থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত উঠে যায়।

বায়োফ্লকে পাবদা চাষের গল্পও শোনা যায়, ইউটিউবে ভিডিওও আছে। ইউটিউবে একটা ভিডিও দেখেছিলাম, ভদ্রলোক বলছেন পাবদায় লাখ টাকা লাভ করেছেন এক চক্রে। সেই রাতে ঘুমাতে পারিনি, মাথায় শুধু ঘুরছিল পাবদার হিসাব।

কিন্তু পরদিন উপজেলার একজন অভিজ্ঞ চাষির সাথে কথা হলো। তিনি বললেন, “পাবদা খেলার জায়গা না নাজমুল, ওটা দিয়ে অনেকে বড় ক্ষতি করেছে।” সেই কথাটা মনে গেঁথে গেছে।

পাবদা এই মাছ পানির গুণের প্রতি এত বেশি সংবেদনশীল যে বিশেষজ্ঞ মৎস্য চাষিরাও অনেক সময় পাবদায় ক্ষতির মুখ পড়েন।

শিং বা মাগুরের চেয়েও বেশি মনোযোগ চাই, পানির তাপমাত্রা থেকে অ্যামোনিয়া সব কিছু খুব সুনির্দিষ্ট রাখতে হয়। একটু ভুল হলেই পাবদা খাওয়া বন্ধ করে দেয়, আর খাওয়া বন্ধ মানে বড় না হওয়া, বড় না হওয়া মানে বিক্রির মৌসুম পার হয়ে যাওয়া।

আমি এখনো পাবদায় নামিনি। নামার ইচ্ছা আছে, কিন্তু আরেকটু অভিজ্ঞতা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব। এটা অনেকটা সেই গল্পের মতো, প্রথমে সাইকেল শিখো, তারপর মোটরসাইকেল। সাইকেল না জেনে মোটরসাইকেলে বসলে পড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক।

মাছ চেনার পাশে মাছের স্বভাবও বুঝতে হবে

কোন মাছ বেছে নেবেন সেটা ঠিক করার পর আরেকটা কথা জানা দরকার, প্রতিটা মাছের স্বভাব আলাদা, আর সেই স্বভাব বুঝেই পরিচর্যা করতে হয়।

কই মাছ একটু লাজুক স্বভাবের। ট্যাংকে হঠাৎ জোরে হাত দিলে বা ঢাকনা খুলে শব্দ করলে ভয় পেয়ে সব মাছ তলায় চলে যায়, কিছুক্ষণ খাবার ছুঁয়ে দেখে না। আমি প্রথমদিকে জানতাম না, খাবার দিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকতাম, ভাবতাম মাছগুলো মরে যাচ্ছে নাকি।

পরে বুঝলাম, একটু সরে গেলেই মাছ উঠে আসে, খাওয়া শুরু করে। এখন খাবার দিয়ে চলে আসি, পাঁচ মিনিট পর এসে দেখি সব খেয়ে ফেলেছে।

তেলাপিয়া ঠিক উলটো। এই মাছ দেখলেই মনে হয় একটু সাহসী, খাবার দেওয়ার আগেই ওপরে উঠে আসে, ছপছপ শব্দ করে। দিনে তিনবার খাবার দিলে যেন খুশি হয়।

শিং মাছ রাতের মাছ। দিনে প্রায় লুকিয়ে থাকে, রাতে খাবার বেশি খায়। শিং চাষ করলে রাতে একবার খাবার দেওয়ার অভ্যাস রাখতে হবে, না হলে মাছ ঠিকমতো বাড়বে না।

এই ছোট ছোট স্বভাবগুলো বই পড়ে শেখা যায় না, ট্যাংকের পাশে সময় দিয়ে নিজেকে দেখে শিখতে হয়।

দুই বছরের অভিজ্ঞতা থেকে আমি যেটা বুঝেছি, সেটা একটা ছোট তালিকায় দিই।

মাছচাষের কঠিনতাবাজার দর (কেজি)নতুনদের জন্য
কইমাঝারি৩০০ – ৫০০ টাকাভালো
তেলাপিয়াসহজ১৫০ – ২৫০ টাকাসবচেয়ে ভালো
শিংকঠিন৫০০ – ৭০০ টাকামাঝারি অভিজ্ঞতার পর
মাগুরকঠিন৫০০ – ৮০০ টাকামাঝারি অভিজ্ঞতার পর
পাবদাখুব কঠিন৮০০ – ১০০০ টাকাঅভিজ্ঞতার পর

তবে শুধু এই তালিকা দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে আরেকটু ভাবুন। আপনার এলাকায় কোন মাছের চাহিদা বেশি, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। আমার গ্রামে শিং-মাগুরের চাহিদা প্রচুর, কারণ এখানকার মানুষ এই মাছ রান্না করে খেতে ভালোবাসেন।

অন্য কোনো এলাকায় তেলাপিয়ার চাহিদা হয়তো বেশি। হোটেল বা রেস্তোরাঁতে যদি বেচতে চান, তাহলে কই বা শিং বেশি কার্যকর। পাইকারের কাছে বড় পরিমাণে বেচতে চাইলে তেলাপিয়া নিরাপদ।

এই তালিকাটা কাগজে দেখতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে একটা কথা মাথায় রাখা জরুরি — সবচেয়ে বেশি লাভ মানে সবচেয়ে বেশি দামের মাছ না, সবচেয়ে বেশি লাভ মানে যে মাছে ঝুঁকি কম আর আপনি যেটা সামলাতে পারবেন।

ইউসুফ ভাই শিংয়ে পনেরো হাজার টাকা খুইয়েছেন, আমি কইয়ে কম দামে বিক্রি করেও সেই টাকা লাভে রেখেছি, কারণ আমার মাছ মরেনি।

বাজার বোঝাটাও চাষের অংশ

শুধু মাছ চাষ জানলেই হবে না, কখন বেচবেন সেটাও বুঝতে হবে। কইয়ের দাম সারা বছর একরকম থাকে না। রমজান মাসে মাছের চাহিদা বাড়ে, দাম বাড়ে।

শীতকালে মাছ একটু ধীরে বাড়ে বলে সরবরাহ কমে, দামও কিছুটা চড়ে। এই সময়টা বুঝে মাছ বিক্রি করলে একই পরিমাণ মাছে বেশি টাকা পাওয়া যায়।

আমি গত চক্রে কই মাছ সাড়ে চার মাসে বিক্রি না করে পাঁচ মাস একটু বেশি বড় করে রেখে রমজানের আগে বিক্রি করলাম।

একই ব্যাচের মাছে আগের চক্রের চেয়ে প্রায় আড়াই হাজার টাকা বেশি পেয়েছিলাম। ওই দুই সপ্তাহের ধৈর্যটা মূল্য দিয়েছিল, মাছের খাবার খরচ যেটুকু বেড়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ফেরত এসেছে।

স্থানীয় হাটের বাইরে পাড়ার রেস্তোরাঁ বা হোটেলে সরাসরি বিক্রির চেষ্টাও করতে পারেন। পাইকারের কাছে গেলে দাম কমে, কিন্তু সরাসরি বিক্রি করলে দাম বেশি পাওয়া যায়।

আমার গ্রামের হাটে বিক্রি হয় তিনশো টাকায়, আর উপজেলার একটা হোটেলে দিচ্ছি চারশো পঞ্চাশ টাকায়। পার্থক্যটা বুঝতেই পারছেন।

হোটেলে বিক্রির কথা প্রথম যে রাতে মাথায় এসেছিল, সেদিন পাইকার মাছের দাম দিয়েছিল দুইশো সত্তর টাকা, আমার মনে হচ্ছিল ঠকে যাচ্ছি।

পরদিন সাইকেলে করে উপজেলায় গিয়ে দুটো হোটেলে গিয়ে নমুনা রেখে এলাম, এক কেজি কই। পরের সপ্তাহে দুটো হোটেলই ফোন দিয়ে জানাল, আর দিতে পারবেন কিনা। সেই থেকে একটা নিয়মিত বিক্রির রাস্তা তৈরি হয়েছে।

কোনটা দিয়ে শুরু করবেন

যদি এই প্রশ্নটা করেন, তাহলে আমার সরাসরি উত্তর হলো, প্রথমবার হলে কই দিয়ে শুরু করুন। তেলাপিয়াও চলে, কিন্তু কইয়ের বাজার দর ভালো আর গ্রামে চাহিদাও বেশি।

এক চক্র সামলে নিন। পানি দেখুন, যন্ত্র বুঝুন, মাছকে চিনুন। তারপর যদি মনে হয় শিং বা মাগুরে যেতে পারবেন, তখন যান। একটু বেশি সময় লাগবে ঠিকই, কিন্তু ইউসুফ ভাইয়ের মতো প্রথম চক্রেই বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে না।

সবচেয়ে বেশি লাভের মাছ কোনটা, এই প্রশ্নের উত্তরটা আসলে একটু জটিল। আপনার অভিজ্ঞতা কতটুকু, আপনার বাজার কোথায়, আপনার হাতে প্রতিদিন কতটুকু সময় আছে, এই তিনটা জিনিস একসাথে মিলিয়ে আপনার জন্য সবচেয়ে ভালো মাছটা ঠিক হবে।

আমি দুই বছরেও পাবদায় নামিনি, কারণ নিজেকে প্রস্তুত মনে করছি না। কিন্তু এই দুই বছরে যা শিখেছি, তার ওপর দাঁড়িয়ে একদিন নামব।

হাটে রহিম ভাইয়ের পাশে বসে সেদিন যখন শিংয়ের দাম দেখছিলাম, মনটা একটু খারাপ হয়েছিল ঠিকই। কিন্তু এখন বুঝি, তাড়াহুড়ো না করে ধাপে ধাপে এগোনোটাই আসল বুদ্ধিমানি।

রহিম ভাইও একসময় তেলাপিয়া দিয়ে শুরু করেছিলেন, এটা তিনি নিজেই বলেছেন। আজ তার শিংয়ের সাফল্য একদিনে আসেনি, কয়েক বছরের ধৈর্যের ফল।

আপনি কোন মাছ দিয়ে শুরু করতে চাইছেন, বা ইতিমধ্যে চাষ করলে কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছে, নিচে লিখতে পারেন। এভাবেই তো আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখি। আপনার একটা অভিজ্ঞতা হয়তো আরেকজন নাজমুলের একটা ভুল বাঁচিয়ে দেবে।