দৈনন্দিন জীবনে এআই এর ১০টি অজানা ব্যবহার

ভূমিকা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বললেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বড় বড় ল্যাবরেটরি, স্বয়ংক্রিয় রোবট কিংবা সায়েন্স ফিকশন সিনেমার কোনো দৃশ্য। আমরা অনেকেই মনে করি, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হলো ভবিষ্যতের প্রযুক্তি, যা সাধারণ মানুষের জীবন থেকে বেশ দূরে। কিন্তু বাস্তব সত্যটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। আপনি কি জানেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত আপনি অজান্তেই শত শত বার এআই ব্যবহার করছেন? হ্যাঁ, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এআই এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এটি ছাড়া আমাদের একটি দিন কল্পনা করাও এখন অসম্ভব।

ডিজিটাল প্রযুক্তির এই যুগে আমরা যখনই একটি স্মার্টফোন স্পর্শ করি, ইন্টারনেটে কোনো কিছু সার্চ করি কিংবা অনলাইনে কেনাকাটা করি, তখনই ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করে জটিল সব এআই অ্যালগরিদম। এই প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে করেছে সহজ, দ্রুত এবং অত্যন্ত আরামদায়ক। এই বিস্তারিত ব্লগপোস্টে আমরা এমন ১০টি সাধারণ ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা করব, যেখানে আমরা নিয়মিত এবং সম্পূর্ণ অজান্তেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছি। এই লেখাটি পড়ার পর এআই সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ বদলে যাবে এবং আপনি বুঝতে পারবেন কীভাবে এই অদৃশ্য প্রযুক্তি আপনার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।

১. যোগাযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (Social Media & Communication)

আমাদের সকালটা শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করার মাধ্যমে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ইউটিউবে আমরা যে সময় কাটাই, তার প্রতিটি সেকেন্ড নিয়ন্ত্রণ করে এআই। নিচে এমন ৩টি ক্ষেত্র বিস্তারিত আলোচনা করা হলো যেখানে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে আমরা নিয়মিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছি:

ক) সোশ্যাল মিডিয়া ফিড ও রিকমেন্ডেশন ইঞ্জিন

আপনি কি কখনো ভেবে দেখেছেন, কেন আপনার ফেসবুক ফিডে ঠিক আপনার পছন্দের বিষয়গুলোই বারবার আসে? কিংবা ইউটিউবে একটি ভিডিও দেখার পর কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরেকটি আকর্ষণীয় ভিডিও প্লে হয়? এর পেছনে রয়েছে এআই-এর ম্যাজিক। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এবং ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো “মেশিন লার্নিং” (Machine Learning) অ্যালগরিদম ব্যবহার করে। এই অ্যালগরিদমগুলো আপনার পছন্দ, অপছন্দ, আপনি কোন পোস্টে কতক্ষণ থেমে আছেন, কোন ধরনের ভিডিওতে লাইক-কমেন্ট করছেন—সবকিছু বিশ্লেষণ করে। এরপর আপনার রুচি অনুযায়ী কনটেন্ট আপনার সামনে পরিবেশন করে। অর্থাৎ, আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ফিডটি সম্পূর্ণ আপনার জন্য কাস্টমাইজড, যা এআই তৈরি করেছে।

খ) ইমেইল ফিল্টারিং এবং স্মার্ট রিপ্লাই (Gmail)

আমরা প্রতিদিন কাজের প্রয়োজনে অসংখ্য ইমেইল আদান-প্রদান করি। কিন্তু আপনি কি লক্ষ্য করেছেন যে, আপনার জিমেইলের (Gmail) স্প্যাম ফোল্ডারে প্রতিদিন কত শত অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর ইমেইল জমা হচ্ছে? আপনাকে কষ্ট করে এই স্প্যাম ইমেইলগুলো বাছাই করতে হয় না। জিমেইলের এআই চালিত স্প্যাম ফিল্টার ৯৯.৯% নিখুঁতভাবে ক্ষতিকর এবং ফিশিং ইমেইলগুলোকে আলাদা করে দেয়। এছাড়া, জিমেইলে যখন আপনি কোনো ইমেইলের উত্তর লিখতে যান, তখন নিচে কিছু সাজেস্টেড বাক্য বা “Smart Reply” দেখতে পান। যেমন: “Thank you!”, “I will check it.” ইত্যাদি। এটিও মূলত ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP) নামক এআই প্রযুক্তির অবদান।

গ) কিবোর্ড অটো-কারেক্ট এবং প্রেডিক্টিভ টেক্সট

স্মার্টফোনে মেসেজ টাইপ করার সময় আমরা প্রায়ই ভুল বানান লিখি, কিন্তু কিবোর্ড স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা ঠিক করে দেয়। শুধু তাই নয়, আপনি পরবর্তী শব্দ কী লিখবেন, তাও কিবোর্ড আগে থেকেই অনুমান করে আপনার সামনে সাজেস্ট করে। Gboard বা SwiftKey-এর মতো কিবোর্ডগুলো আপনার টাইপিং প্যাটার্ন এবং ভাষা ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণ করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে। আপনি যত বেশি টাইপ করবেন, কিবোর্ডের এআই আপনার লেখার স্টাইল তত বেশি শিখবে এবং আরও নিখুঁতভাবে শব্দ সাজেস্ট করবে।

২. বিনোদন ও অনলাইন কেনাকাটা (Entertainment & E-commerce)

অবসর সময়ে বিনোদন নেওয়া কিংবা ঘরে বসে কেনাকাটার ক্ষেত্রেও দৈনন্দিন জীবনে এআই-এর ব্যবহার অপরিসীম। আমরা কীভাবে এই ক্ষেত্রগুলোতে এআই-এর সুবিধা নিচ্ছি, তা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

ক) ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও মিউজিক স্ট্রিমিং (Netflix, Spotify, YouTube)

নেটফ্লিক্স (Netflix) বা স্পটিফাই (Spotify) ব্যবহারের সময় আমরা প্রায়ই চমৎকার সব নতুন সিনেমা বা গানের সন্ধান পাই। এগুলো কিন্তু কাকতালীয়ভাবে আমাদের সামনে আসে না। নেটফ্লিক্সের এআই অ্যালগরিদম আপনার দেখার ইতিহাস (Viewing History), দিনের কোন সময়ে আপনি সিনেমা দেখছেন, এবং আপনার মতো একই রুচির অন্যান্য দর্শকরা কী দেখছেন—তা বিশ্লেষণ করে। স্পটিফাই-এর “Discover Weekly” প্লেলিস্টটিও সম্পূর্ণ এআই দ্বারা তৈরি, যা ব্যবহারকারীর পছন্দের ওপর ভিত্তি করে প্রতি সপ্তাহে নতুন গান সাজেস্ট করে।